
একসময় খুলনার শিল্পাঞ্চল মানেই ছিল কর্মচাঞ্চল্য, মিলের সাইরেন আর উৎসবমুখর শ্রমিকপাড়া। ঈদ এলেই জমে উঠত আনন্দ, মিলগেটজুড়ে থাকত কেনাকাটা, মেলা আর ব্যস্ততা। কিন্তু এখন সেই শিল্পাঞ্চল যেন নীরব এক জনপদ। বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকলগুলোর মরিচা ধরা গেট আর নিস্তব্ধ চিমনি আজও সাক্ষ্য দিচ্ছে হাজারো শ্রমিক পরিবারের দীর্ঘশ্বাসের।
খুলনার প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলসের সাবেক শ্রমিক সিরাজ মিয়ার জীবনও সেই দীর্ঘশ্বাসেরই প্রতিচ্ছবি। বয়স এখন ৬০ বছর। একসময় মিলের ফিনিশিং বিভাগে কাজ করে তিন ছেলে ও এক মেয়েকে বড় করেছেন। মিল বন্ধ হওয়ার পর আর নতুন কোনো কাজে যেতে পারেননি। এখন মিলগেটের সামনে ছোট্ট একটি দোকান বসিয়ে কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন।
ঈদুল আজহার দিনেও তার জীবনে নেই উৎসবের আমেজ। কোরবানি দেওয়া তো দূরের কথা, স্বাভাবিক আনন্দটুকুও যেন হারিয়ে গেছে। ঈদের নামাজ শেষে তাই বাড়িতে না থেকে চলে এসেছেন দোকানে। তিনি বলেন, মিলের সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু চাকরির নয়, জীবনের। এখানেই কেটেছে তার যৌবন, এখান থেকেই সংসার চলেছে। কিন্তু দুর্নীতি, অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার কারণে সব শেষ হয়ে গেছে।
সিরাজ মিয়ার অভিযোগ, পাটকল পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম চলেছে। ভালো পাটের বদলে নিম্নমানের পাট কেনা, হিসাব জালিয়াতি, তেল সরবরাহে দুর্নীতিসহ নানা কারণে মিলগুলো ধ্বংস হয়েছে। এখন যন্ত্রপাতিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু দেখার কেউ নেই।
২০২০ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ জুটমিল করপোরেশন (বিজেএমসি) রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি পাটকল বন্ধ ঘোষণা করে। এর মধ্যে খুলনার ৯টি পাটকলও রয়েছে। তখন বলা হয়েছিল তিন মাস পর মিলগুলো আবার চালু করা হবে। কিন্তু ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো মিল চালু হয়নি। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন।
শুধু পাটকলই নয়, খুলনার দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি, নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিলসহ একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে একসময়কার প্রাণচঞ্চল শিল্পাঞ্চল আজ কার্যত শিল্পহীন নগরীতে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে ঈদ বা অন্য কোনো উৎসব এলে পুরো শিল্পাঞ্চল আলোকিত হয়ে উঠত। বাজারে বাড়ত কেনাকাটা, শ্রমিক পরিবারগুলোতে থাকত উৎসবের আনন্দ। এখন সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। অনেক শ্রমিক এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। যারা রয়ে গেছেন, তারা বেকারত্ব আর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছেন।
প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলসের সাবেক শ্রমিক নেতা খলিলুর রহমান বলেন, অধিকাংশ শ্রমিক সামান্য কিছু পাওনা পেলেও দেনা শোধ করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ ভিক্ষা করতেও বাধ্য হচ্ছেন। তিনি জানান, এখনো শতাধিক শ্রমিক বিভিন্ন জটিলতায় তাদের পাওনা বুঝে পাননি।
তার মতে, শ্রমিকরা কখনোই মিল ধ্বংসের জন্য দায়ী নন। বরং দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার শিকার হয়েছেন তারা। তিনি চান আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আবার মিলগুলো চালু করা হোক, যাতে শ্রমিকরা অন্তত কাজ করে বাঁচতে পারেন।
ঈদুল আজহার এই দিনে খুলনার শিল্পাঞ্চলে তাই উৎসবের চেয়ে হতাশা আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের গল্পই বেশি শোনা যাচ্ছে। মিলের সাইরেন থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন থেমে গেছে হাজারো শ্রমিক পরিবারের স্বপ্নও।