
বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর প্রকল্পে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেলে এই কার্যক্রম শুরু হওয়ার মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া আগামী তিন বছর পর্যন্ত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইউরেনিয়াম সরবরাহ করবে। ফলে এই সময়ের মধ্যে জ্বালানি নিয়ে বাংলাদেশকে আলাদা করে আমদানি বা ব্যবস্থাপনার চিন্তা করতে হবে না। তবে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর দেশকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করতে হবে।
এছাড়া জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানি দুই বছর পর পর পরিবর্তন করতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বাভাবিক প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ার অংশ।
প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত। এর প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া, যা আগামী ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়া প্রযুক্তিগত, আর্থিক এবং কারিগরি সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে। এখানে তৃতীয় প্রজন্মের রি-অ্যাক্টর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে উন্নত স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই কেন্দ্রের বড় সুবিধা হলো জ্বালানি দক্ষতা। উদাহরণস্বরূপ, এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন কয়লা প্রয়োজন হয়। কিন্তু একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মাত্র ২৭ টন ইউরেনিয়ামই যথেষ্ট।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায়ও রূপপুর কেন্দ্র অনেক বেশি কার্যকর। ধারণা করা হচ্ছে, এই কেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকে বছরে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, তা প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাসের সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমান।
প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা। ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে। এতে পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ প্রায় ছয় টাকা ধরা হলেও অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, বাস্তবে এটি প্রায় ১২ টাকায় পৌঁছাতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য হওয়ায় এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আরও মনে করছেন, রূপপুর শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি কেন্দ্র নয়, বরং এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি বড় মাইলফলক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬০ বছর মেয়াদী এই বিদ্যুৎকেন্দ্র যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত চালানো সম্ভব। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়া বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।