
মূত্রনালিতে পাথর, চিকিৎসাবিজ্ঞানে যাকে কিডনি বা ইউরিনারি স্টোন বলা হয়, বর্তমানে একটি সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত কষ্টদায়ক স্বাস্থ্য সমস্যা। অনেকেই মনে করেন এটি হঠাৎ তৈরি হয়, তবে বাস্তবে এটি ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে গড়ে ওঠে।
মানবদেহের কিডনি প্রতিনিয়ত রক্ত ফিল্টার করে বর্জ্য ও অতিরিক্ত খনিজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। কিন্তু কোনো কারণে যদি এই খনিজ ও লবণগুলো সঠিকভাবে বের না হয় বা প্রস্রাব ঘন হয়ে যায়, তখন সেগুলো একত্রিত হয়ে ছোট ছোট স্ফটিক তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে এই স্ফটিক বড় হয়ে পাথরে পরিণত হয়।
সবচেয়ে বড় কারণ হলো পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া। শরীরে পানি কম থাকলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায় এবং খনিজ পদার্থ সহজেই জমাট বাঁধে। বিশেষ করে গরম আবহাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম বা শারীরিক পরিশ্রমের সময় পানি না খেলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার, বেশি প্রাণিজ প্রোটিন (মাংস, ডিম) এবং কিছু নির্দিষ্ট অক্সালেটযুক্ত খাবার যেমন পালংশাক, বাদাম ইত্যাদি অতিরিক্ত খেলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়—ব্যক্তিভেদে ঝুঁকি ভিন্ন হয়।
পরিবারে কারও কিডনি বা মূত্রনালির পাথরের ইতিহাস থাকলে অন্য সদস্যদের মধ্যেও এই সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। অর্থাৎ, বংশগত বা জেনেটিক কারণও এখানে একটি বড় ভূমিকা পালন করে।
ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা হরমোনজনিত সমস্যা থাকলে শরীরের খনিজ ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, যা পাথর তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা বা বিছানায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যেও এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।
কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ বা দীর্ঘমেয়াদি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের ফলে প্রস্রাবের খনিজ ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে। এতে ধীরে ধীরে স্ফটিক তৈরি হয়ে পাথরে রূপ নেয়।
অনেকেই দীর্ঘ সময় প্রস্রাব চেপে রাখেন, যা মূত্রনালির স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করে। এটি সরাসরি পাথরের প্রধান কারণ না হলেও ঝুঁকি বাড়াতে সহায়তা করে।
ছোট পাথর অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। কিন্তু বড় হলে তীব্র পেট বা কোমরের ব্যথা, প্রস্রাবে জ্বালা, বমিভাব, ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ এবং কখনো প্রস্রাবে রক্ত দেখা দিতে পারে। এই ব্যথা অনেক সময় হঠাৎ শুরু হয়ে অসহনীয় হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। পাশাপাশি সুষম খাদ্যাভ্যাস, লবণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমও সহায়ক। যাদের পূর্বে এই সমস্যা হয়েছে, তাদের নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
মূত্রনালির পাথর একটি ধীরে গড়ে ওঠা সমস্যা হলেও সচেতনতা থাকলে সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। শরীরের ছোট ছোট সংকেতকে অবহেলা না করে সময়মতো ব্যবস্থা নিলে বড় জটিলতা এড়ানো যায়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই এই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।