
বাসভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি, এর মধ্যেই নতুন করে রেলভাড়া বাড়ানোর আলোচনা শুরু হয়েছে। এতে করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে ট্রেনের ভাড়া অপরিবর্তিত থাকলেও বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ভাড়া সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্র অনুযায়ী, ট্রেন পরিচালনার সবচেয়ে বড় ব্যয় জ্বালানি খাতে। প্রতিদিন ট্রেন চালাতে প্রায় ১ লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। সম্প্রতি প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় শুধু জ্বালানি খাতেই প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। বছরে এই অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫৪ কোটি টাকার বেশি।
শুধু জ্বালানি নয়, রেলের অন্যান্য ব্যয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ট্রেনের যন্ত্রাংশ আমদানি, বগি মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার দর বৃদ্ধির কারণে। ফলে সামগ্রিকভাবে রেলওয়ের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারকে প্রতি বছর বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়। সেই ভর্তুকির চাপ কমাতেই ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় ভাড়া সমন্বয় করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তার মতে, ভাড়া ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো যৌক্তিক হতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারই নেবে।
অন্যদিকে, জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন আগের তুলনায় কম পরিমাণে ডিজেল সরবরাহ করছে বলে জানা গেছে। প্রতি কিস্তিতে প্রায় ১০ শতাংশ করে সরবরাহ কমানো হচ্ছে। ফলে রেলওয়েকে এখন মজুত জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা দিয়ে আর মাত্র ১৫ দিন চলা সম্ভব বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিল বাবদ রেলের বকেয়া অর্থও বেড়ে গেছে। আগে যেখানে বকেয়ার পরিমাণ ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই বিপুল বকেয়া পরিশোধ করতে আগামী বাজেটে বাড়তি বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এদিকে সাধারণ যাত্রীরা এ সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বিগ্ন। কম খরচে আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য অনেকেই ট্রেনকে প্রধান পরিবহন হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ভাড়া বাড়ানো হলে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ঢাকা-গাজীপুর রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী এক যাত্রী জানান, বাসভাড়া বাড়ার পর ট্রেনই ছিল তাদের ভরসা। এখন যদি ট্রেন ভাড়াও বাড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে এখনো ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, দূরত্বভেদে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়তে পারে।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, রেলভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি এখনো প্রস্তাব ও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়ন হলে সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়বে, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।