
হামের কারণে মাত্র ৫ মাস বয়সী জমজ শিশুকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছে যশোরের চৌগাছা উপজেলার চন্দ্রপাড়া গ্রামের রতন আহমেদ ও মীম খাতুন দম্পতি। গত ১৮ মে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। বর্তমানে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত অপর জমজ সন্তানকে বাঁচাতে হাসপাতালে দিন কাটাচ্ছেন তারা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বিয়ের প্রায় তিন বছর পর ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর এই দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় জমজ ছেলে ও মেয়ে। সন্তান জন্মের খবরে পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ছেলের নাম রাখা হয় আবরার ফারাবি এবং মেয়ের নাম সাউদা ইসলাম সারা।
তবে সেই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র কয়েক মাসের মাথায় হামে আক্রান্ত হয়ে ৫ মাস ২১ দিন বয়সে মৃত্যুবরণ করে আবরার ফারাবি। শোকাহত মা মীম খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, সন্তানের কষ্টের মুহূর্তগুলো তিনি অসহায়ভাবে চেয়ে চেয়ে দেখেছেন, কিন্তু কিছুই করতে পারেননি।
তিনি বলেন, সন্তান হারানোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। একটি মা তার সন্তানের মৃত্যু কীভাবে সহ্য করে, তা বোঝানো যায় না। নিজের বাচ্চাকে বাঁচাতে না পারার কষ্টই এখন তার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা।
শিশুটির বাবা রতন আহমেদ দীর্ঘ ১৫ বছর দুবাই ছিলেন। পরে দেশে ফিরে বিয়ে করেন এবং পরিবার শুরু করেন। তিনি জানান, সন্তানের চিকিৎসার জন্য তিনি ঝিনাইদহ, যশোর ও খুলনা—একাধিক জায়গায় ছোটাছুটি করেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
রতন আহমেদ বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, কিন্তু হামের কাছে হার মেনেছি। জন্মের পর থেকে বাচ্চারা বুকের দুধ পায়নি, কৌটার দুধ খেয়ে বড় হচ্ছিল। সেই শিশুটিই আজ আর নেই।”
তিনি আরও জানান, দুই শিশুর যত্ন নিতে পরিবার প্রচুর অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ছিল। প্রতিদিন কৌটার দুধ কিনে খাওয়ানোও কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। তবুও তারা সন্তানদের সুস্থ করার জন্য সব চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
বর্তমানে বেঁচে থাকা জমজ সন্তান নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। পরিবারটি এখন একদিকে সন্তানের মৃত্যুর শোক, অন্যদিকে আরেক সন্তানের জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে ব্যস্ত।
শিশুটির দাদি মনোয়ারা বেগম বলেন, নাতিকে প্রতিদিন মনে পড়ে। তার খেলা, হাসি, ডাক—সবই এখন স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। পরিবারে এখন শুধু কান্না আর শূন্যতা।
স্থানীয় প্রতিবেশীরাও এই ঘটনার কথা শুনে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, জমজ সন্তান নিয়ে পরিবারটি খুবই খুশি ছিল। কিন্তু হঠাৎ রোগে তাদের জীবনে নেমে এসেছে ভয়াবহ দুঃখ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ শিশুদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে যাদের বয়স কম এবং যাদের পুষ্টির ঘাটতি রয়েছে। সময়মতো টিকা এবং চিকিৎসা না পেলে পরিস্থিতি মারাত্মক হতে পারে।
এ ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে শিশুদের টিকাদান ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরিবারটি এখন এক সন্তান হারানোর শোক বুকে নিয়ে অন্য সন্তানের বেঁচে থাকার জন্য প্রার্থনা করছে।