
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নির্বাচনে “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” বা কারচুপির কোনো সুস্পষ্ট অভিযোগ তারা পায়নি। বরং পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট মাত্রার স্বচ্ছতা বজায় ছিল বলে মনে করছে সংস্থাটি।
রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেন মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস। তিনি বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে যেসব অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা হয়েছে, তার অনেকগুলোর সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল পাওয়া যায়নি। তার মতে, ভোটগ্রহণের সময় প্রশাসনিক ও কারিগরি দিক থেকে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সন্তোষজনক ছিল।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন-এর ভূমিকার কথা। সংস্থাটি নির্বাচন পরিচালনায় কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে বলে মনে করছে ইইউ। ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি এবং ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়ায় কিছু ইতিবাচক দিক স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
তবে শুধুমাত্র ইতিবাচক দিক তুলে ধরেই থেমে থাকেনি ইইউ। ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে তারা ১৯টি সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে ৬টি সুপারিশকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এই সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—নির্বাচনী আইনের সংস্কার, রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো, নির্বাচনী প্রচারণায় সমতা নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা জোরদার করা।
ইইউ মনে করছে, এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচন আরও অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে। একইসঙ্গে ভোটারদের আস্থা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের নির্বাচন নিয়ে ইতিবাচক বার্তা যাবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—বিশেষ করে অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার বিষয়ে—সেগুলোর বাস্তব প্রতিফলন ভবিষ্যতে দেখা যাবে বলে আশা করছে ইইউ। এতে করে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করেছে। তারা নির্বাচনের আগের প্রস্তুতি, প্রচারণা, ভোটগ্রহণ এবং পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার দিন প্রায় ২২৩ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দেশের ৬৪টি জেলায় দায়িত্ব পালন করেন। এদের মধ্যে ইইউ সদস্য রাষ্ট্র ছাড়াও কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রতিনিধিরাও ছিলেন।
এই বিশাল পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ফলে এটি একটি বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ইইউর এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের নির্বাচনকে পুরোপুরি নিখুঁত না বললেও একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ডের মধ্যে রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা ভবিষ্যতের জন্য কিছু করণীয় দিকও স্পষ্ট করে দিয়েছে, যা বাস্তবায়ন করা হলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হতে পারে।