
পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে যাচ্ছে। কেন্দ্রটি চালু হলে এর স্বাভাবিক কার্যকাল ধরা হয়েছে প্রায় ৬০ বছর, যার মধ্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়ন করা গেলে এই কেন্দ্রটির আয়ু আরও প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আজ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রকল্পটি নির্মাণ পর্যায় থেকে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এতে বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হবে।
প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রটির একটি ইউনিটে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম লোড করা হবে। এই ধাপে শতাধিক নিরাপত্তা পরীক্ষা ও যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। এরপর কয়েক মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।
কেন্দ্রটির প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটে বর্তমানে জ্বালানি লোডিং শুরু হচ্ছে। মোট ১৬৩টি ইউরেনিয়াম বান্ডেল ব্যবহার করা হবে এই ইউনিটের চুল্লিতে, যা পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন করবে।
এই তাপ পানিকে বাষ্পে রূপান্তর করবে, যা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। পুরো প্রক্রিয়াটি নিউক্লিয়ার ফিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হবে, যা অত্যন্ত দক্ষ ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি পদ্ধতি।
কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করা হলে তা প্রায় দেড় বছর পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারে। ফলে অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো নিয়মিত তেল, গ্যাস বা কয়লা সরবরাহের প্রয়োজন হবে না। প্রতি দেড় বছর পর এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি পরিবর্তন করা হবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ প্রায় ৬ টাকা ধরা হলেও বর্তমানে তা প্রায় ১২ টাকা হতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া এবং তাদের প্রতিষ্ঠান রোসাটম। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পগুলোর একটি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রূপপুর প্রকল্প চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমবে।
সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।