
রসালো ও সুস্বাদু ফল লিচুর বাম্পার ফলনে খুশির আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ৫৫৫ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার প্রায় ২৯ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যেই স্থানীয় বাজারগুলোতে লিচু উঠতে শুরু করেছে এবং প্রতি শত লিচু ২০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ভালো ফলনের কারণে জেলার লিচু চাষিদের মুখে এখন স্বস্তির হাসি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনুকূল আবহাওয়া, কম ঝড়-বৃষ্টি এবং সময়মতো পরিচর্যার কারণে এ বছর লিচুর ফলন বেশ ভালো হয়েছে। ফলে উৎপাদন ও বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশাবাদী কৃষি বিভাগ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী কসবা, আখাউড়া ও বিশেষ করে বিজয়নগর উপজেলা এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে লিচুর চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লিচুর বাগান রয়েছে বিজয়নগরে। এখানকার পাহাড়ি জমি ও মাটির গুণাগুণ লিচু চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় প্রতি বছরই ভালো ফলন পাওয়া যায়।
বিজয়নগরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে শত শত লিচুর বাগান। পাহাড়পুর, বিষ্ণুপুর, কাঞ্চনপুর, কালাছড়া, মেরাসানি, সিঙ্গারবিল, চম্পকনগর, কাশিনগরসহ বহু এলাকায় লিচুর চাষ হয়েছে ব্যাপক পরিসরে। এছাড়া আখাউড়া উপজেলার ধলেশ্বর, রাজাপুর ও মনিয়ন্দ এলাকা এবং কসবার গোপীনাথপুর ও বায়েক ইউনিয়নেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লিচুর বাগান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে লিচু পাকতে শুরু করলেও বিজয়নগরের লিচু মে মাসের শুরুতে বাজারজাতের উপযোগী হয়। ফলে বাজারে আলাদা চাহিদা তৈরি হয় এ অঞ্চলের লিচুর প্রতি। বিজয়নগরের সবচেয়ে বড় লিচুর বাজার হিসেবে পরিচিত আউলিয়া বাজারে প্রতিদিনই ভিড় করছেন পাইকার ও ক্রেতারা। এছাড়া মেরাসানিতেও জমে উঠেছে লিচুর বেচাকেনা।
শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাইরেও বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসছেন লিচু কিনতে। কুমিল্লা, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, নোয়াখালী, চাঁদপুর, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, ফেনীসহ রাজধানী ঢাকা থেকেও পাইকাররা এসে লিচু সংগ্রহ করছেন।
লিচুর বাগানগুলো এখন দর্শনার্থীদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাগানের ছবি দেখে অনেকে ঘুরতে আসছেন। চিকিৎসক দম্পতি শ্যামল দেবনাথ ও শিবলী দেবী জানান, তারা নিজের হাতে গাছ থেকে লিচু পেড়ে খেয়ে বেশ আনন্দ পেয়েছেন। চিকিৎসক হিমেল খানও পরিবার নিয়ে বাগানে ঘুরতে এসে একই অভিজ্ঞতার কথা জানান।
রহমত আলী নামের এক লিচু চাষি জানান, তিনি ৬০টি গাছের একটি বাগান চার লাখ টাকায় কিনেছেন। তাঁর বাগানের চায়না থ্রি জাতের লিচু প্রতি শ’ ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা এবং বোম্বে জাতের লিচু ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক দর্শনার্থী সরাসরি বাগানে গিয়ে লিচু কিনছেন, পাশাপাশি পাইকারিভাবেও বিক্রি হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার মুনসী তোফায়েল হোসেন বলেন, জেলার বিশেষ করে বিজয়নগরের মাটির গুণাগুণ লিচু উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত চাষিদের পরামর্শ ও মনিটরিং করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এবারের বাম্পার ফলনে চাষিরা যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার আশা করছেন, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।