
অবৈধভাবে মাটি কাটা ও পাহাড় ধ্বংসের ঘটনায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সত্ত্বেও থামছে না মাটিখেকোদের দৌরাত্ম্য।
জেলার বিভিন্ন উপজেলার নদীতীর, পাহাড় ও কৃষিজমিতে প্রকাশ্যে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন ফসলি জমির উপরিভাগ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে বড় বড় গর্ত, যার ফলে পাশের জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এসব মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে পুকুর ভরাট, জমি উঁচু করা এবং ইটভাটায় বিক্রির জন্য। ফলে কৃষিজমি ধ্বংসের পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও পড়ছে মারাত্মক প্রভাব।
প্রশাসন নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালালেও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হচ্ছে না। অভিযানে জড়িতদের জেল-জরিমানা করা হচ্ছে, খননযন্ত্র ও ট্রাক জব্দ করা হচ্ছে। কিন্তু অভিযানের পরপরই আবার নতুন করে শুরু হচ্ছে মাটি কাটা।
জানা গেছে, প্রশাসনের অধিকাংশ অভিযান দিনের বেলায় হওয়ায় মাটিখেকোরা কৌশল পরিবর্তন করে রাতের আঁধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের উপস্থিতির আগাম তথ্য পেয়ে তারা দ্রুত সরে পড়ছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জমির শ্রেণি পরিবর্তন বা কৃষিজমি থেকে মাটি উত্তোলনের জন্য যথাযথ অনুমতি প্রয়োজন। কিন্তু এই নিয়ম না মেনেই অবাধে চলছে মাটি কাটা। এমনকি সরকারি খাল ভরাটের ঘটনাও ঘটছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন অভিযানে একাধিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হলেও তাতে ভয় পাচ্ছে না অপরাধীরা। উদাহরণস্বরূপ, কসবা উপজেলা-এর একটি এলাকায় পাহাড় কাটার দায়ে দুজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং পাঁচটি ট্রাক জব্দ করা হয়েছে।
এছাড়া সরাইল উপজেলা-এর মেঘনা নদীর তীর থেকে মাটি ও বালু কাটার দায়ে কয়েকজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে আখাউড়া ও কসবার বিভিন্ন স্থানে জরিমানা ও অভিযানের ঘটনাও ঘটেছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে এসব কর্মকাণ্ড চলছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে মাটি কাটা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে ভয় পাচ্ছেন।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, সীমিত জনবল ও তথ্যের অভাবে সব জায়গায় একসঙ্গে অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া প্রকৃত দোষীদের অনেক সময় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
কসবা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তানজিল কবির বলেন, ফসলি জমি থেকে মাটি কাটা আইনত অপরাধ এবং এ বিষয়ে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে জমির মালিকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে আখাউড়া উপজেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. কফিল উদ্দিন মাহমুদ বলেন, বড় আর্থিক লাভের কারণে অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে এই কাজে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে শুধুমাত্র অভিযান দিয়ে এটি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ মাটি কাটা দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
সব মিলিয়ে, প্রশাসনের অভিযান চললেও মাটিখেকোদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড থামাতে সমন্বিত উদ্যোগ ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।