
রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক আজকের দিনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক আলোচনার বিষয়। অনেকেই এটিকে একটি শক্তিশালী কৌশলগত জোট হিসেবে দেখলেও ইতিহাস বলছে, এই সম্পর্ক বরাবরই জটিল, দ্বন্দ্বপূর্ণ এবং মূলত স্বার্থনির্ভর।
এই সম্পর্কের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ১৮২৯ সালে, যখন তৎকালীন পারস্যে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার গ্রিবোয়েদভ তেহরানে বিদ্রোহীদের হামলায় নিহত হন। তাকে শুধু হত্যা নয়, তার মরদেহ বিকৃত করে ফেলে রাখা হয়েছিল। এই ঘটনা রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের গভীর অবিশ্বাস ও উত্তেজনার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
গ্রিবোয়েদভ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী—কবি, নাট্যকার, সুরকার ও কূটনীতিক। পারস্যের শাহ ফাতহ-আলি শাহের দাবির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই তার মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি রুশ দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়া কিছু আর্মেনীয় শরণার্থীকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান, যা জনরোষের সৃষ্টি করে।
এই ঘটনার পেছনে আরও বড় প্রেক্ষাপট ছিল ১৮২৬-২৮ সালের রুশ-পারস্য যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে পারস্যকে বিপুল ক্ষতিপূরণ দিতে হয় এবং নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল অবস্থায় পড়তে হয়। এর ফলে জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে, যা শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরিত হয়।
উনবিংশ শতাব্দীর বাকি সময়জুড়ে রাশিয়া পারস্যের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করতে থাকে এবং তাকে একটি দুর্বল রাষ্ট্র হিসেবে ব্যবহার করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পারস্যকে একটি কৌশলগত ঘুঁটি হিসেবে দেখা হতো, যা “গ্রেট গেম” নামে পরিচিত।
পরবর্তী সময়ে সম্পর্কের আরও পরিবর্তন আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরানের তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এতে দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে এবং ইরান পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পরও ইরান সোভিয়েত ইউনিয়নকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেনি। বরং প্রায়ই তাদের ‘ছোট শয়তান’ হিসেবে উল্লেখ করা হতো। তবে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
নতুন বিশ্বব্যবস্থায় রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে ইরানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত কিছু নিষেধাজ্ঞা ঠেকাতে বা বিলম্বিত করতে রাশিয়া ভূমিকা রাখে।
বিনিময়ে ইরান রাশিয়া থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করে এবং দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ থেকে শুরু করে জ্বালানি খাতে যৌথ উদ্যোগ—সব ক্ষেত্রেই সহযোগিতা দেখা যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করেছে। ২০১৫ সালে বাশার আল-আসাদের সরকারকে টিকিয়ে রাখতে তারা যৌথভাবে হস্তক্ষেপ করে। এছাড়া ব্রিকস জোটে ইরানের অন্তর্ভুক্তিতেও রাশিয়ার সমর্থন ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্ক আদর্শগত নয়, বরং সম্পূর্ণ বাস্তব স্বার্থনির্ভর। দুই দেশকে কাছাকাছি এনেছে মূলত পশ্চিমা চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান। অর্থাৎ, তাদের বন্ধুত্বের ভিত্তি একটি অভিন্ন প্রতিপক্ষ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সম্পর্ক কিছুটা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে রাশিয়ার অবস্থান এবং ইরানের প্রত্যাশার মধ্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক একটি জটিল সমীকরণ। ইতিহাসের দ্বন্দ্ব, বর্তমানের কৌশল এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়েই এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাই এটিকে নিছক বন্ধুত্ব বা জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি একটি পরিবর্তনশীল এবং স্বার্থনির্ভর সম্পর্ক।