
বাংলাদেশে প্রাণঘাতী রোগ জলাতঙ্কের চিকিৎসায় ব্যবহৃত টিকার মজুদ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। একদিকে হাসপাতালগুলোতে টিকার সংকটের অভিযোগ উঠছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে কোনো টিকার ঘাটতি নেই।
জলাতঙ্ক এমন একটি মরণব্যাধি, যেখানে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর হার প্রায় শতভাগ। তাই কুকুর বা বিড়ালের কামড়ের পর দ্রুত ভ্যাকসিন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে টিকা না পাওয়ার অভিযোগ বাড়ছে।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিশেষ করে Rabies Immunoglobulin (RIG) টিকার তীব্র সংকট রয়েছে। এই টিকা সাধারণত গুরুতর কামড়ের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দিতে ব্যবহৃত হয়। তবে সরকারি সরবরাহ না থাকায় অনেক রোগীকে বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
অন্যদিকে Anti Rabies Vaccine (ARV)-এর ক্ষেত্রেও কিছু এলাকায় ঘাটতির কথা জানা গেছে। যদিও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
একজন রোগীর অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, টিকার দাম ৯০০ টাকা পর্যন্ত হলেও অনেক নিম্নআয়ের মানুষ তা কিনতে পারছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে ধার-দেনা করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
স্থানীয় হাসপাতালগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিদিন গড়ে বহু মানুষ কুকুর বা বিড়ালের কামড় নিয়ে হাসপাতালে আসেন। কিন্তু পর্যাপ্ত সরকারি টিকা না থাকায় তারা সীমিত পরিমাণে সেবা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কোথাও কোথাও টিকা রেশনিং করে দেওয়া হচ্ছে—অত্যন্ত দরিদ্র রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে রাজধানীর কিছু বড় হাসপাতালে, যেমন মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে, টিকার সরবরাহ তুলনামূলকভাবে ভালো বলে জানা গেছে। ফলে ঢাকার বাইরে থেকে রোগীদের সেখানে যেতে হচ্ছে।
এদিকে দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (Expanded Programme on Immunization Bangladesh)-এর অধীনে হামের মতো অন্যান্য টিকাতেও ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাবে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে বলে জানা গেছে।
ইপিআই কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, কেন্দ্রীয় গুদামে কিছু টিকার মজুদ কমে গেছে এবং বাফার স্টক নেই। তবে তারা আশা করছেন, নতুন সরবরাহ দ্রুত আসবে।
একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, বাফার স্টক না থাকা একটি বড় ঝুঁকি। কারণ সরবরাহ ব্যাহত হলে দ্রুত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে, যেমন সম্প্রতি হামের ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগ নাকচ করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশে কোনো টিকার সংকট নেই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সব হাসপাতালেই সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিনি আরও দাবি করেন, স্থানীয় ফান্ড এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সহায়তায় টিকা কেনা হচ্ছে, তাই কোথাও সেবা বন্ধ হচ্ছে না।
তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ও কেন্দ্রীয় দাবির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার সঠিক মজুদ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ বিতরণ এবং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে।