
যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বুধবার (২২ এপ্রিল) রাত ১০টা ১০ মিনিটের দিকে কেন্দ্রটির ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ১ নম্বর ইউনিটে ত্রুটি দেখা দিলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে কেন্দ্রটির তিনটি ইউনিটই এখন সম্পূর্ণ অচল অবস্থায় রয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়লার সঙ্গে পাথর চলে আসায় বয়লার পাইপ ফেটে যায় এবং কুলিং ফ্যান ভেঙে পড়ে। এই কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ইউনিটটি বন্ধ করতে হয়। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, মেরামত কাজ শুরু হয়েছে, তবে পুরো ইউনিট সচল করতে কমপক্ষে ৪ থেকে ৫ দিন সময় লাগতে পারে।
এই কেন্দ্রের অন্যান্য ইউনিট আগেই বন্ধ ছিল। ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৩ নম্বর ইউনিট ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর থেকেই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। একইভাবে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ২ নম্বর ইউনিট ২০২০ সাল থেকেই বন্ধ অবস্থায় আছে। এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসেও ১ নম্বর ইউনিট কিছুদিন বন্ধ ছিল এবং পরে অল্প সময়ের জন্য চালু হলেও আবারও বন্ধ হয়ে গেল।
ফলে বর্তমানে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে পুরোপুরি শূন্য উৎপাদনে চলে গেছে কেন্দ্রটি।
২০০৬ সালে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ওপর নির্ভর করে এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়। শুরুতে দুটি ইউনিটে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো, পরে ২০১৭ সালে আরও একটি ২৭৫ মেগাওয়াট ইউনিট যুক্ত হয়। কিন্তু শুরু থেকেই যান্ত্রিক সমস্যা, কয়লার মান এবং রক্ষণাবেক্ষণজনিত সমস্যার কারণে কেন্দ্রটি কখনো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারেনি।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহে। দিনাজপুরসহ পার্শ্ববর্তী ৮ জেলায় লোডশেডিং বেড়ে গেছে। জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে।
বিশেষ করে গত এক সপ্তাহ ধরে উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছে। ভ্যাপসা গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ ঘাটতি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। দিনে-রাতে বিভিন্ন সময়ে লোডশেডিং হচ্ছে, যা জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রটি উত্তরাঞ্চলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র ছিল। এটি বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক ইউনিট বন্ধ থাকা এবং বারবার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরোনো প্রযুক্তি, কয়লার মান সমস্যা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এই সংকটের মূল কারণ হতে পারে।
বর্তমানে কেন্দ্রটি দ্রুত মেরামত করে পুনরায় চালু করার চেষ্টা চলছে। তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে আরও সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।