
ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের নীতি পরিবর্তন ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলো থেকে আসা শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে টিউশন ফি কয়েকগুণ বাড়ানো হচ্ছে, যা আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই কার্যকর হবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাচেলর বা লাইসেন্স পর্যায়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের এখন থেকে বছরে প্রায় ৩,০০০ ইউরো টিউশন ফি দিতে হবে। আগে এই ফি ছিল মাত্র ১৭৮ ইউরো, ফলে এক লাফে খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
ফ্রান্সের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা “চুজ ফ্রান্স ফর ল’অঁসেইনমঁ সুপেরিয়র” নীতির অংশ হিসেবেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকারের দাবি, এই নীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আরও মানসম্পন্ন ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।
২০১৯ সালে ফ্রান্স সরকার বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা টিউশন ফি কাঠামো চালু করেছিল। তবে বাস্তবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সেই নিয়ম পুরোপুরি কার্যকর করেনি। এবার সরকার কঠোরভাবে সেই নীতি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ফি ছাড়ের সুযোগ কমিয়ে আনবে। ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে এই ফি থেকে অব্যাহতি দিতে পারবে।
তবে ইতোমধ্যে যারা ফ্রান্সে পড়াশোনা শুরু করেছেন, তারা আগের নিয়ম অনুযায়ী সুবিধা বজায় রাখতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ এই সিদ্ধান্ত মূলত নতুন শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব ফেলবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হলো “উচ্চ সম্ভাবনাময়” আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা এবং উচ্চশিক্ষার মান আরও উন্নত করা। একই সঙ্গে বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষে চাকরির সুযোগ ও ওয়ার্ক ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার কথাও জানানো হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থী সংগঠন ও শিক্ষকরা বলছেন, এই নীতির ফলে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অনেকেই উচ্চশিক্ষার সুযোগ হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ইতোমধ্যেই এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১২ মে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সংগঠন রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানায়। একই সঙ্গে আগামী ২৬ মে দেশজুড়ে আরও বড় ধরনের আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, এই নীতি ফ্রান্সের ঐতিহ্যগতভাবে সাশ্রয়ী উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করবে এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য দেশটিকে কম আকর্ষণীয় করে তুলবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। কম খরচে মানসম্পন্ন শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ থাকার কারণে হাজার হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী দেশটিতে পড়তে যান। তবে নতুন এই সিদ্ধান্ত সেই চিত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সব মিলিয়ে ফ্রান্সের নতুন শিক্ষা নীতি একদিকে যেমন সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ, অন্যদিকে এটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আগামী দিনে এই সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হয় এবং এর প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়, তা নিয়ে নজর থাকবে শিক্ষাবিশ্বের।