
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে ঋণচুক্তিকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে অতীতে জনগণকে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এমন শর্তে রাজি হয়েছিল, যা জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ERF) আয়োজিত “সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক সক্ষমতা ও সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা” শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, সরকারের বর্তমান নীতি হলো আইএমএফ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিকে সম্মান করা। তবে দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো শর্ত থাকলে তা পুনর্বিবেচনা করা হবে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে।
আইএমএফের শর্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তারা বলেছে, তাদের শর্ত পরিবর্তন করা যাবে, কিন্তু আমরা কোনো শর্ত পরিবর্তন করতে পারব না।” তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে একটি দুর্বল অর্থনীতির ওপর কঠোর শর্ত চাপিয়ে দেওয়া যায়।
উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি থেকে উন্নতির পথে রয়েছে। তবে কর-জিডিপি অনুপাত ৯.২ শতাংশে উন্নীত করার মতো লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জিং।
তিনি আরও বলেন, আইএমএফ টার্নওভার ট্যাক্স আরোপের পরামর্শ দিলেও এটি ব্যবসায়ীদের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এ বিষয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।
আইএমএফের আর্টিকেল-৪ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি সব দেশের জন্য প্রযোজ্য হলেও ভর্তুকি কমানোর ক্ষেত্রে সমতা থাকা উচিত, যা বাস্তবে সব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না।
তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ এসডিআর (Special Drawing Rights) পুনর্বিন্যাসের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল থাকলেও দেশে বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বাড়ানো হয়েছিল। এখন ডিজেলের দাম সমন্বয় করলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে, তাই সরকার আপাতত দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে আইএমএফের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত তিন বছরে দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় কৃষকদের সহায়তায় “কৃষক কার্ড” চালু করা হচ্ছে, তবে সরাসরি ভর্তুকি নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে।
সেমিনারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (CPD) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্ত বাস্তবায়নে জটিলতা থাকায় ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তি পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা বাজারে নেতিবাচক সংকেত দেবে।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিকে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন এবং সরকারের সতর্ক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে হলে উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে।
এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রস্তাবিত ব্যয়ের বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ব্যবসায়িক খাতে উচ্চ সুদের হার এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগে বড় বাধা সৃষ্টি করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী নেতারা, যারা জ্বালানি, ব্যাংকিং ও রপ্তানি খাতের নানা সমস্যা তুলে ধরেন।
সব মিলিয়ে, আইএমএফ ঋণচুক্তি ও দেশের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে এই সেমিনার নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।