
ইরান যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এখন শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক কেমিক্যাল শিল্পেও। বিশেষ করে ‘কিং অব কেমিক্যালস’ নামে পরিচিত সালফারের বাজারে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। সালফার মূলত তেল ও গ্যাস উৎপাদনের উপজাত হিসেবে পাওয়া যায় এবং এটি সালফিউরিক অ্যাসিড তৈরির প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই অ্যাসিডকে আবার শিল্পজগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ধরা হয়, যা সার উৎপাদন, ধাতু প্রক্রিয়াকরণ, খনিশিল্প ও ওষুধ শিল্পে অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য সালফার রপ্তানির সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। বৈশ্বিক মোট সালফার সরবরাহের প্রায় অর্ধেকই এই অঞ্চল থেকে আসে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে সালফারের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
জ্বালানি ও কেমিক্যাল বিশ্লেষকদের মতে, সালফার সংকটের প্রভাব শুধু একটি খাতে সীমাবদ্ধ নয়। সালফিউরিক অ্যাসিড সার উৎপাদনের মূল উপাদান হওয়ায় কৃষি খাতে সরাসরি প্রভাব পড়ছে। সার উৎপাদন ব্যয় বাড়লে খাদ্য উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়, যা বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
অন্যদিকে খনিশিল্পেও সালফার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তামা, নিকেল ও অন্যান্য ধাতু উত্তোলন ও পরিশোধনে সালফিউরিক অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়। ফলে সরবরাহ সংকট দীর্ঘ হলে এই শিল্পগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে। ইতোমধ্যেই কিছু দেশ বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ঘাটতি পূরণ করা সহজ নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রপ্তানি ও আমদানি নির্ভরতা এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো সালফিউরিক অ্যাসিডের বড় ক্রেতা। সরবরাহ ব্যাহত হলে এসব দেশের শিল্প উৎপাদনেও ধীরগতি দেখা দিতে পারে। একইসঙ্গে কিছু দেশ ইতোমধ্যে রপ্তানি সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে, যা বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে সালফার বাজারে সংকট আরও গভীর হবে। শুধু দাম বাড়া নয়, সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক শিল্পে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সার উৎপাদন কমে গেলে কৃষি খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় চাপে ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। জ্বালানি থেকে শুরু করে কেমিক্যাল শিল্প পর্যন্ত এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ছে। সালফার সংকট সেই বড় ঝুঁকিরই একটি প্রতিফলন, যা ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে আরও বড় অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।