
বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব। প্রতি বছরের মতো এবারও রাজধানীর রমনার বটমূলে ঐতিহ্যবাহী প্রভাতী আয়োজনের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেয় হাজারো মানুষ। সূর্যোদয়ের পর ভোর সোয়া ৬টায় ছায়ানটের আয়োজনে শুরু হয় এই বহুল প্রতীক্ষিত অনুষ্ঠান, যা দীর্ঘদিন ধরে বাঙালির সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
এবারের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল— “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির”— যা মূলত একটি মানবিক, মুক্তচিন্তার এবং সাহসী সমাজ গঠনের আহ্বান বহন করে। ছায়ানট তাদের ৫৯তম আয়োজনকে সাজিয়েছে এমনভাবে, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য, দেশপ্রেম এবং লোকজ জীবনের সুর একসঙ্গে মিশে এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই পরিবেশিত হয় ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানটি, যা নতুন দিনের সূচনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। এরপর ধারাবাহিকভাবে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি এবং বাংলা লোকসংগীত। সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে ফুটে ওঠে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের গভীরতা।
অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাঁই, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়সহ প্রখ্যাত কবি ও সুরকারদের গান পরিবেশিত হয়। তাদের সৃষ্টির মাধ্যমে মানবতা, প্রেম, সাম্য এবং দেশপ্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় উপস্থিত দর্শকদের মাঝে। পাশাপাশি লোকসংগীতের পরিবেশনায় উঠে আসে গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল রূপ, যা শহুরে জীবনে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
রমনার বটমূল ঘিরে ভোর থেকেই মানুষের ঢল নামে। নানা বয়সী মানুষ, পরিবার-পরিজন নিয়ে অংশ নেয় এই উৎসবে। অনেকেই ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে আসেন, যা পুরো পরিবেশকে আরও রঙিন করে তোলে। নারী-পুরুষ, শিশু থেকে প্রবীণ—সবাই মিলে উপভোগ করেন বাঙালির এই অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক আয়োজন।
ছায়ানটের এই আয়োজন শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। দেশের বিভিন্ন প্রতিকূলতা, সংকট ও অস্থিরতার মধ্যেও এই আয়োজন মানুষের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করে। আয়োজকদের মতে, বিগত বছরের সব ‘আবর্জনা’ দূর করে নতুন বছরে আরও মানবিক ও সহনশীল সমাজ গঠনের প্রত্যয় নিয়েই এই আয়োজন।
ছায়ানটের এবারের বিশেষ আহ্বান ছিল— “আমরা নির্বিঘ্নে সংস্কৃতি চর্চা করতে চাই।” এই আহ্বান বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে সংস্কৃতি চর্চা অবাধ ও নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন। তারা মনে করেন, সংস্কৃতির চর্চা একটি জাতির পরিচয় বহন করে এবং এটি রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।
সব মিলিয়ে, সুর, কবিতা এবং লোকজ ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে রমনার বটমূল আবারও প্রমাণ করেছে, বাংলা নববর্ষ শুধু একটি দিন নয়—এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।