
ফরিদপুর জেলার ময়েনদিয়া বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দুই গ্রামের দ্বন্দ্ব এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সালথা উপজেলার খারদিয়া গ্রাম এবং বোয়ালমারী উপজেলার একটি পক্ষের মধ্যে এই বিরোধের প্রভাব সরাসরি পড়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ওপর। নিরাপত্তাহীনতা ও হামলার আশঙ্কায় খারদিয়া গ্রামের অন্তত শতাধিক ব্যবসায়ী তাদের দোকানপাট খুলতে পারছেন না, ফলে বাজারে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ময়েনদিয়া বাজারে প্রায় ৫০০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাজারটির নিয়ন্ত্রণ ছিল বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মান্নানের হাতে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সালথা উপজেলার খারদিয়া গ্রামের বিএনপি-সমর্থক টুলু মিয়া ও মুশফিক মিয়া ওরফে জিহাদ মিয়ার অনুসারীদের হাতে।
এই নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব সংঘর্ষের জেরে খারদিয়া গ্রামের ব্যবসায়ীরা বাজারে যেতে ভয় পাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, বাজারে প্রবেশ করতে গেলে প্রতিপক্ষের লোকজন তাদের হুমকি দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে মারধরও করে।
মিনহাজ ট্রেডার্সের মালিক মো. ফায়েক জানান, তিনি গত দুই মাস ধরে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারছেন না। তার দোকানে থাকা রড, সিমেন্টসহ কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তিনি বলেন, তিনি একা নন, আরও শতাধিক ব্যবসায়ী একই পরিস্থিতির শিকার।
কাপড় ব্যবসায়ী আকরাম শিকদার বলেন, সংঘর্ষ দুটি পক্ষের মধ্যে হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। দোকান খুলতে গেলেই হামলার শিকার হতে হয়। এতে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।
এছাড়া ভ্যানচালক ছায়েদুল মুন্সী অভিযোগ করেন, তিনি বাজারে গেলে তাকে মারধর করা হয় এবং খারদিয়া গ্রামের কাউকে বাজারে না আসার জন্য হুমকি দেওয়া হয়।
তবে বাজারের পাশের কিছু ব্যবসায়ী ভিন্ন মতও প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, খারদিয়া গ্রামের কিছু নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিও নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ীকে বাজারে যেতে বাধা দিচ্ছেন। ফলে পুরো পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করছে।
ময়েনদিয়া বাজারের ইজারাদার টুলু মিয়া অভিযোগ করেন, সংঘর্ষের পর থেকে তিনি ইজারার টাকা তুলতে পারছেন না। তার লোকজন বাজারে গেলে তাদের ভয় দেখিয়ে বের করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে খারদিয়া গ্রামের বাসিন্দা মুশফিক মিয়া ওরফে জিহাদ বলেন, ব্যবসায়ীদের নিরাপদে ব্যবসা করার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ জরুরি।
স্থানীয়দের মতে, এই বিরোধ নতুন নয়। পূর্ব শত্রুতার জের ধরে দীর্ঘদিন ধরে বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর পরমেশ্বরদী ইউনিয়ন ও মান্নান পরিবারের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, যাতে কয়েকজন আহত হন। এই ঘটনার সঙ্গে খারদিয়া গ্রামের লোকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
এরপর থেকেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ীরা নিয়মিত হুমকি, মারধর ও বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশেষ করে পেঁয়াজের মৌসুমে চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগ বেড়ে যায়।
অন্যদিকে মান্নান পরিবারের সদস্য মো. শাহিন মিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, বর্তমানে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসা চলছে। তার মতে, কিছু ব্যক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং বাজারের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
ময়েনদিয়া বাজার কমিটির সভাপতি বিষ্ণু পদ সাহা বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে আগের সংঘর্ষের পর থেকে খারদিয়া গ্রামের একটি অংশ বাজারে আসা বন্ধ রেখেছে বলে তিনি জানান।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, এলাকায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশ টহল জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা যাতে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারেন, সে বিষয়ে প্রশাসন গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। তারা দ্রুত সমস্যার সমাধান এবং নিরাপদ পরিবেশ ফিরে পাওয়ার জন্য প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছেন।