
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ সুদহার শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে মত দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তারা মনে করছেন, এই উচ্চ সুদের হার বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং বিভিন্ন খাতের প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা এসব বিষয় তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে মতবিনিময় করা হয়।
ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে ম্যান-মেইড ফাইবার থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টরসহ নানা সম্ভাবনাময় খাতে উচ্চ সুদহার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বিনিয়োগ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সুদহার কমানো জরুরি বলে তারা মত দেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দেন, বাংলাদেশকে বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে হলে অন্যান্য দেশের সফল নীতিমালা ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। তিনি প্রমাণভিত্তিক আইনগত ও নীতিগত কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে বিনিয়োগ পরিবেশ আরও শক্তিশালী হয়।
ব্যবসায়ীরা ব্যাংকিং খাত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তারা বলেন, ব্যাংকিং খাতকে আরও উন্মুক্ত করা হলে দেশীয় কোম্পানিগুলো নিজেদের আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী বিদেশ থেকে সহজে ঋণ গ্রহণ করতে পারবে। একই সঙ্গে স্থানীয় বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোরও পরামর্শ দেওয়া হয়।
ডিজিটাল ব্যাংকিং চালুর মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন সহজ করা এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর কথাও আলোচনায় আসে। এতে করে ব্যবসার গতি বাড়বে এবং প্রতিযোগিতা আরও জোরদার হবে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা।
এছাড়া, রাষ্ট্রীয় অকার্যকর সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যাংকিং ও বিমা খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নীতিমালা সহজ করার কথাও উল্লেখ করা হয়।
রপ্তানি খাতের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে নতুন খাত বিকাশের ওপর জোর দেন। আউটডোর সরঞ্জাম, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তারা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে এসব খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
বিনিয়োগ আকর্ষণে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে ব্যবসায়ীরা বলেন, বাংলাদেশ এখন এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগ টানতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তাই শুধু কম খরচের শ্রম নয়, বরং একটি বাস্তবসম্মত ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
এক্ষেত্রে ব্যবসা পরিচালনার খরচ, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এবং নীতিমালাকে আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করে উন্নত করার সুপারিশ করা হয়। তারা বিশেষভাবে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের উদাহরণ উল্লেখ করেন।
লজিস্টিক খাতের দুর্বলতাও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশে জিডিপির একটি বড় অংশ লজিস্টিক ব্যয়ে চলে যায়, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বেশি। তাই বন্দর, বিমানবন্দর এবং পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বে টার্মিনাল প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
কর ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও জোর দিয়ে বলা হয়। বর্তমান কর কাঠামো জটিল হওয়ায় ব্যবসা পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে মত দেন ব্যবসায়ীরা। তারা বাণিজ্য করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ কর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পরামর্শ দেন।
সবশেষে, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি অর্জনের লক্ষ্যে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল ও রোডম্যাপ প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বৈঠক শেষে জানানো হয়, ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সার্বিকভাবে, এই বৈঠকটি সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।