
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের বড় মাজগ্রামে সাউন্ড বক্স ও মাইকসেট ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে মাইকিং করে জানানো হয়েছে, কেউ এই নির্দেশনা অমান্য করলে তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হবে, এমনকি কবরস্থানে দাফন করতেও দেওয়া হবে না।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) দিনব্যাপী মাইকিংয়ের মাধ্যমে এই ঘোষণা প্রচার করা হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর গ্রামবাসীর একাংশের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জুমার নামাজের পর অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বড় মাজগ্রাম জামে মসজিদ কমিটি এ সিদ্ধান্ত নেয়। মসজিদের ইমাম ও খতীব মাওলানা ওয়ালীউল্লাহ ফরিদী জানান, গ্রামে উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্স বাজানোর কারণে নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত এবং অসুস্থ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছিল। এ কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মসজিদ কমিটির কোষাধ্যক্ষ কুরবান আলী বলেন, বিয়ে বা খৎনা অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত শব্দের কারণে ধর্মীয় কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। তাই সম্মিলিতভাবে সাউন্ড বক্স নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট স্থানে সীমিত আকারে অনুষ্ঠান করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটি সাম্প্রতিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া গেছে। জানা যায়, গ্রামের একটি খৎনা অনুষ্ঠানে সাউন্ড বক্স বাজানোকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে মসজিদ কমিটি এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
তবে গ্রামবাসীর একাংশ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, এভাবে সামাজিক বয়কট বা দাফন না করার মতো ঘোষণা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব লিটন আব্বাস বলেন, প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব স্বাধীনতা রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার নেই। বিষয়টি প্রশাসনের মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে মসজিদ কমিটির সভাপতি আমির হোসেন জানান, মূলত উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্স ব্যবহার বন্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মাইকিংয়ে কী ভাষায় প্রচার করা হয়েছে, তা তিনি নিশ্চিত নন বলে জানান।
আইনগত দিক থেকে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ পুলিশ-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের প্রচলিত আইনে এভাবে গানবাজনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার সুযোগ নেই। তবে অতিরিক্ত শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, কুষ্টিয়ার এই ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে ধর্মীয় সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে।