
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশের বাণিজ্য খাত এখনো স্থিতিশীল রয়েছে। বিশেষ করে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য গতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এই বন্দরের মাধ্যমে ৩ হাজারের বেশি জাহাজে প্রায় ২৬ লাখ কন্টেইনার এবং ১০ কোটির বেশি মেট্রিক টন কার্গো পণ্য হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। একই সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ এককভাবে ৫৮ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, মার্চ মাসজুড়ে ইরান-এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহনে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে হাজার হাজার পণ্যবাহী জাহাজ আটকে পড়লেও চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা যায়নি। বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ৭.৩৯ শতাংশ, কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৪.৭৫ শতাংশ এবং জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে ৫.৬২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ জানান, বন্দরের ভেসেল টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমিয়ে আনা হয়েছে এবং বর্তমানে ‘জিরো ওয়েটিং টাইম’ বজায় রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, অটোমেশন ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর ফলে বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়েছে এবং আমদানি-রফতানি সূচকে কোনো বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
যদিও যুদ্ধের প্রভাবে মার্চ মাসে আমদানির পরিমাণ কিছুটা কমেছে, তবুও উচ্চ শুল্কহারযুক্ত জ্বালানি তেল, ক্যাপিটাল মেশিনারি ও খাদ্যপণ্য আমদানির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। শুধু মার্চ মাসেই চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে প্রায় ৬ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানান, বৈশ্বিক সংকট থাকা সত্ত্বেও তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, অর্থবছরের শেষদিকে বিশেষ করে জুন মাসে রাজস্ব আদায় আরও বাড়বে এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।
এদিকে বেসরকারি অফডক খাতেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৯ মাসে রফতানিতে ৩.৭ শতাংশ এবং আমদানিতে প্রায় ৩৫.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। অফডকগুলোতে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের পরিধিও বাড়ানো হয়েছে, যা বাণিজ্য কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেছে।
তবে উদ্বেগের বিষয়ও রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো জাহাজ ও কন্টেইনার পরিবহনে ভাড়া বাড়িয়েছে। ফলে এপ্রিল মাসে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম কিছুটা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক সংকটের মাঝেও চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে এর ওপর চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।