
বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে আন্তর্জাতিক কল ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক গেটওয়ে অপারেটরস ফোরাম (আইওএফ) নিয়ে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। খাত-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘ এক দশক ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সালমান এফ রহমান, যাকে অনেকে এই কাঠামোর ‘নাটের গুরু’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তার প্রভাবাধীন সাতটি আন্তর্জাতিক গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) অপারেটরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কল ব্যবস্থাপনায় একটি অস্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করা হয়, যা থেকে সরকারের প্রায় আট হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
এই কাঠামোর অংশ হিসেবে ‘মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ (এমডিএফ/এমডিএস) নামে একটি তহবিল গঠন করা হয়। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই তহবিলে ৬০০ কোটির বেশি টাকা জমা পড়ে এবং এর বড় অংশ ব্যয়ের নামে তুলে নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এর উল্লেখযোগ্য অংশ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে, যার কোনো আইজিডব্লিউ লাইসেন্স নেই।
এই অনিয়মের অভিযোগে বিটিআরসি রাজধানীর গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে। মামলায় ২৭ জনকে আসামি করা হয়েছে, যার মধ্যে আইওএফের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রয়েছেন। ইতোমধ্যে কয়েকজন আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছেন, তবে অভিযোগের মূল নেপথ্য ব্যক্তিরা এখনো আইনের আওতার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনিয়মের মূল সূত্র খুঁজতে হলে আন্তর্জাতিক কল ব্যবস্থাপনার নীতিগত পরিবর্তনের দিকে নজর দিতে হবে। ২০০৭ সালে প্রণীত আইএলডিটিএস নীতিমালার মাধ্যমে একটি তিনস্তরবিশিষ্ট কাঠামো গড়ে তোলা হয়, যেখানে আইজিডব্লিউ, আইসিএক্স এবং মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে নির্দিষ্ট সংযোগ ছিল।
তবে পরবর্তীতে ‘আইজিডব্লিউ অপারেটরস সুইচ’ (আইওএস) চালুর মাধ্যমে এই কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনা হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক কল একটি কেন্দ্রীয় পয়েন্ট দিয়ে পরিচালিত হতে শুরু করে, যার নিয়ন্ত্রণ ছিল আইওএফের হাতে। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং নির্দিষ্ট কিছু অপারেটরের প্রভাব বাড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, সাতটি প্রভাবশালী আইজিডব্লিউ অপারেটর মোট রাজস্বের বড় অংশ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিত, যেখানে অন্যান্য অপারেটররা তুলনামূলকভাবে কম সুবিধা পেত। এছাড়া কল টার্মিনেশন রেট নির্ধারণেও অস্বচ্ছতা ছিল, যা প্রতিযোগিতা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি খাতের মতোই টেলিকম খাতেও এই ধরনের সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই অনিয়মের প্রকৃত চিত্র জানতে পূর্ণাঙ্গ টেকনো-কমার্শিয়াল ও ফরেনসিক অডিট জরুরি।
এই বিষয়ে টেলিকম বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, আইওএস কাঠামো, রেট নির্ধারণ পদ্ধতি এবং এমডিএফ তহবিলের ব্যয়—সবকিছু বিস্তারিতভাবে তদন্ত করা না হলে প্রকৃত তথ্য সামনে আসবে না।
এদিকে সাম্প্রতিক বৈঠকে আইওএফ ও আইজিডব্লিউ অপারেটরদের মধ্যকার অপারেশনাল চুক্তির অনুমোদন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিটিআরসি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কল ব্যবস্থাপনায় নতুন নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, ব্যাংক গ্যারান্টি এবং মনিটরিং জোরদারের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, আইওএফ কেলেঙ্কারি এখন দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত কতটা কার্যকরভাবে এগোয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা কতটা বাস্তবায়িত হয়।