
দেশের জ্বালানি খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) ঘাটতিকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘ দেড় মাসের বেশি সময় ধরে নতুন কোনো ক্রুড অয়েলের চালান দেশে না আসায় কাঁচামালের সংকটে পড়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল)। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত নতুন চালান না এলে উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল আনার প্রক্রিয়া চলছে, যা ১০ থেকে ১৩ এপ্রিলের মধ্যে দেশে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, দ্রুত এলসি খোলা এবং জাহাজ ভাড়া করার মাধ্যমে এই চালান আনার চেষ্টা চলছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সৌদি আরবে আটকে থাকা ‘নরডিক পোলাক্স’ নামের একটি তেলবাহী জাহাজও দেশে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই জাহাজে প্রায় ১ লাখ টন ক্রুড অয়েল রয়েছে। এই দুই উৎস থেকে তেল আসতে পারলে শোধনাগারটি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।
বাংলাদেশে সাধারণত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে এই সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তেল আমদানিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহন হয়, যার ওপর বাংলাদেশের আমদানিও নির্ভরশীল।
সর্বশেষ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রায় ১ লাখ টন ক্রুড অয়েলের চালান দেশে পৌঁছেছিল। এরপর আর কোনো চালান আসেনি। ফলে শোধনাগারের মজুত দ্রুত কমে এসেছে। গত ৩০ মার্চের হিসাবে প্রায় ৩০ হাজার টন তেল মজুত ছিল, যা দিয়ে সীমিত উৎপাদন চালিয়ে ১০-১২ এপ্রিল পর্যন্ত টিকে থাকার চেষ্টা চলছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির দৈনিক শোধন ক্ষমতা প্রায় ৪ হাজার ১০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শোধনাগারটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত এই স্থাপনাটি ডিজেল, পেট্রোল, কেরোসিন, এলপিজি, ফার্নেস অয়েলসহ মোট ১৩ ধরনের জ্বালানি পণ্য উৎপাদন করে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইআরএল দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করে। এটি বন্ধ হয়ে গেলে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে, যা ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। ইআরএলের মহাব্যবস্থাপক (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কন্ট্রোল) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, নতুন চালান সময়মতো পৌঁছালে শোধনাগার বন্ধ করতে হবে না। আর সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়—প্রতি বছর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও এক-দুই মাস বন্ধ রাখা হয়।
সব মিলিয়ে, বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দ্রুত আমদানি নিশ্চিত করা এবং বিকল্প সরবরাহ উৎস খুঁজে বের করাই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।