
দেশে সার ডিলার নিয়োগ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে প্রণীত ‘সমন্বিত নীতিমালা ২০২৫’ ঘিরে তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ডিলার, বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ—তাদের মতামত উপেক্ষা করেই নতুন এই নীতিমালা জারি করা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে কৃষি খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৪৬ হাজার সার ডিলার এই খাতের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তাদের অংশগ্রহণ বা মতামত ছাড়াই নীতিমালাটি প্রণয়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন নীতিমালার মাধ্যমে সার সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে, যা কার্যত একটি নতুন সিন্ডিকেট তৈরির পথ খুলে দেবে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এতে মাঠপর্যায়ে সার সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। কোথাও অতিরিক্ত সার মজুত থাকবে, আবার কোথাও তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। এর ফলে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে এবং চরম পরিস্থিতিতে সামাজিক অস্থিরতাও তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে সার সরবরাহ ব্যবস্থার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯৫ সালে প্রথমবারের মতো একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়, যার মাধ্যমে আগের বড় সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। এরপর ১৯৯৭, ২০০৩ এবং সর্বশেষ ২০০৯ সালে নীতিমালায় সংশোধন এনে একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি করা হয়।
২০০৯ সালের নীতিমালার আওতায় দীর্ঘদিন ধরে দেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থা তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। কৃষকের দোরগোড়ায় সময়মতো সার পৌঁছানো এবং বড় ধরনের অনিয়ম বা সংকট এড়ানো সম্ভব হয়েছে এই কাঠামোর মাধ্যমে।
তবে নতুন নীতিমালা ২০২৫ সেই স্থিতিশীল কাঠামোকে উপেক্ষা করে প্রণয়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই বিদ্যমান কার্যকর ব্যবস্থাকে বদলে ফেলা হলে তা পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
ডিলার প্রতিনিধিরা বলছেন, নতুন নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক পর্যায়ে সার সংরক্ষণে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া বিপুল পরিমাণ সার মজুত রাখার ঝুঁকি কেউ নিতে চাইবে না। এতে সরবরাহ ব্যাহত হলে কৃষকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারেন এবং চরম পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মতামত, সম্পূর্ণ নতুন নীতিমালা প্রণয়ন না করে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা যেতে পারত। এতে করে স্থিতিশীলতা বজায় রেখে যুগোপযোগী পরিবর্তন সম্ভব হতো।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি খাত দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এ খাতে কোনো ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত গ্রহণ করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, সার নীতিমালা ২০২৫ ঘিরে যে বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধান না করা হলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এজন্য সংশ্লিষ্টদের দাবি—নীতিমালাটি পুনর্বিবেচনা করে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং বাস্তবসম্মত কাঠামো নিশ্চিত করা হোক।