
দেশে চলমান জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে বিদ্যুৎ খাতে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে, যার ফলে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ নির্ভর করে গ্যাস ও তেলের ওপর। প্রায় ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্যাসভিত্তিক এবং প্রায় ১৭ শতাংশ তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দামের অস্থিরতা এবং সরবরাহ সংকটের কারণে এই দুই উৎসই এখন ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্য অংশের সক্ষমতা এখনও পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
এর অন্যতম কারণ হলো পটুয়াখালীর RNPL Thermal Power Plant দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দুটি ইউনিটে মোট ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি কয়লা সরবরাহ চুক্তি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে গত বছরের ১১ নভেম্বর থেকে কেন্দ্রটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
কয়লা আমদানির টেন্ডার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত না হওয়ায় কেন্দ্রটির জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়, যার ফলে এত বড় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
এদিকে কেন্দ্রটি চালু করতে ইতোমধ্যে অস্থায়ীভাবে ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন কয়লা আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যার একটি চালান ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে এবং আরও কয়েকটি জাহাজ আসার পথে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কয়লা দিয়ে কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালালে সাড়ে তিন মাসের বেশি সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হবে। প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার টন কয়লা ব্যবহার করে কেন্দ্রটি ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা গেলে বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন চাহিদা বৃদ্ধির সময় এই কেন্দ্রগুলোর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি সংকট দেশের বিদ্যুৎখাতে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। আরএনপিএলসহ বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দ্রুত চালু করা গেলে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হলেও জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।