
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলায় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত অন্তত ১২ জন চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন। শনিবার (১৩ মার্চ) লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। নিহতদের মধ্যে চিকিৎসক, নার্স এবং প্যারামেডিক সদস্যরা রয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননের বুর্জ কালাউইয়া শহরের একটি ক্লিনিককে লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বাহিনী সরাসরি বিমান হামলা চালায়। হামলার ফলে সেখানে কর্মরত একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
একই সময়ে দক্ষিণ লেবাননের সাওয়ানে শহরে আরেকটি হামলার ঘটনাও ঘটে। ওই হামলায় আরও দুইজন প্যারামেডিক নিহত হয়েছেন বলে লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এসব হামলার ফলে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের লিটানি নদীর ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ধ্বংস করার কথা স্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ওই সেতুটি হিজবুল্লাহ অস্ত্র পরিবহন এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে ব্যবহার করছিল। তাই এটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
এদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীও লেবাননকে সতর্ক করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত লেবাননকে অবকাঠামোগত ক্ষতির মূল্য দিতে হবে। তার এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকেও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির প্রধান নাইম কাসেম এক টেলিভিশন ভাষণে বলেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য তাদের সংগঠন পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। তিনি এই সংঘাতকে “অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ” হিসেবে বর্ণনা করেন।
নাইম কাসেমের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতের সংঘর্ষে ইসরায়েল বড় ধরনের চমকের মুখোমুখি হতে পারে বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই সংঘাত শুধু সীমান্তের লড়াই নয়, বরং বৃহত্তর একটি যুদ্ধের অংশ।
গত সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার কথা উল্লেখ করে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর থেকেই সংঘাত ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে।
চলমান সংঘাতে লেবাননের সাধারণ মানুষের জীবনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণের কারণে বহু মানুষ হতাহত হচ্ছেন। অনেক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
সিডন শহরের কাছে সাম্প্রতিক এক হামলায় একই পরিবারের চার শিশুসহ কয়েকজন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এসব ঘটনার ফলে মানবিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
এদিকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর একটি ঘাঁটিতেও ইসরায়েলি গোলা আঘাত হেনেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে ওই ঘটনায় শান্তিরক্ষীদের মধ্যে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে আন্তর্জাতিক মহলও উদ্বেগ প্রকাশ করছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বৈরুত সফরকালে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সংঘাত অব্যাহত থাকলে মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের সহায়তার জন্য ৩২৫ মিলিয়ন ডলারের মানবিক সহায়তার আবেদনও জানানো হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, যুদ্ধের কারণে বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে লেবাননের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। সামরিক হামলা ও পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতায় মানবিক সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।