
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ভয়াবহ বিমান হামলার মুখে পড়েছে ইরানের রাজধানী তেহরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শুক্রবার (১৩ মার্চ) দিবাগত রাত থেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে বহু বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ভোররাত পর্যন্ত তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিকভাবে বোমাবর্ষণ চালানো হয়। শহরের মধ্য, উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম—প্রায় সব অংশেই বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গভীর রাতে হঠাৎ শুরু হওয়া এই বিস্ফোরণে শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত প্রায় ১টার দিকে তেহরানের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। পশ্চিম তেহরানের পুনক এলাকার বাসিন্দারা জানান, অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয় এবং মানুষজন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি শুরু করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বাসিন্দা লিখেছেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি অন্তত আটটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। তার ভাষায়, বিস্ফোরণ অনেকক্ষণ ধরেই চলছিল এবং পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তিনি আশঙ্কা করছিলেন রাতটি হয়তো সংঘাতের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রাত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
হামলার সময় যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ইন্টারনেট সেবা সীমিত হয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী লিখেছেন, ইন্টারনেট সংযোগ এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যাচ্ছিল না। তার মন্তব্য ছিল, যোগাযোগ পাওয়া কঠিন হলেও মৃত্যু যেন খুব সহজ হয়ে উঠেছে।
আরেকজন ব্যবহারকারী তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে লেখেন, বহু বছর ধরে যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। তার মতে, শাসকদের ভুল সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে সাধারণ মানুষ এখন যুদ্ধ ও ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
হামলার ফলে বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। ফাতেমা নামের এক নারী জানান, তার পরিচিত একটি পরিবারের বাড়ি থানার কাছাকাছি এলাকায় ছিল, যা হামলার সময় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ওই এলাকায় এক সপ্তাহ আগে বাসিন্দাদের এলাকা খালি করার সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল। অধিকাংশ মানুষ সরে গেলেও একটি বৃদ্ধ দম্পতি সেখানে থেকে গিয়েছিলেন, কারণ তাদের যাওয়ার মতো অন্য কোনো জায়গা ছিল না।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বলেন, শুক্রবারের হামলা চলমান সংঘাত শুরুর পর সবচেয়ে তীব্র হামলাগুলোর একটি। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের প্রায় ১৫ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
তেল আবিবের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইরানের ভূখণ্ডে প্রায় ৭ হাজার ৬০০ বার হামলা চালানো হয়েছে, যার বেশিরভাগই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে।
এদিকে এই হামলার জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীও পাল্টা পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোর দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
চলমান সংঘাতের প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে এবং ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
হামলার মধ্যেই শুক্রবার তেহরানে একটি প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা অংশ নেন। সমাবেশে উপস্থিত বিক্ষোভকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিবের দাবি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সম্ভাব্য উত্তরসূরি মোজতবা খামেনিও আহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই সংঘাতের ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ভেতরে ইতোমধ্যে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্য ও ওষুধের সংকটও ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে।