
কার্পেটশিল্প মানবসভ্যতার প্রাচীনতম শিল্পগুলোর একটি। মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য অঞ্চলে এই শিল্পের ইতিহাস বহু পুরোনো। বিশেষ করে Iraq ও Iran অঞ্চলের আরবাঞ্চলে ইসলাম আগমনের বহু পূর্ব থেকেই কার্পেট তৈরির প্রচলন ছিল।
এই অঞ্চলগুলো উৎকৃষ্ট মানের পশম ও সুতার জন্য বিখ্যাত ছিল। সেই কারণে প্রাচীন আরব সমাজে কার্পেট, পাটি এবং গালিচা ছিল অভিজাত সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাজদরবার, অভিজাত পরিবারের বসতবাড়ি এবং ধর্মীয় স্থানগুলোতে কার্পেটের বিশেষ ব্যবহার দেখা যেত।
ইসলামের আগমনের পর এই শিল্প নতুন রূপ পায়। বিশেষ করে নামাজ আদায়ের জন্য ব্যবহৃত Prayer Rug (Jainamaz) তৈরির মাধ্যমে কার্পেটশিল্পের সঙ্গে ধর্মীয় সংস্কৃতির গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
মুসলিম সমাজে দৈনন্দিন জীবন, ইবাদত এবং ঘর সাজানোর কাজে দৃষ্টিনন্দন কার্পেট ও জায়নামাজ তৈরি হতে শুরু করে। এগুলো শুধু ব্যবহারিক জিনিসই ছিল না, বরং সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হতো।
কার্পেটশিল্পের বিকাশে Armenia অঞ্চলের তাঁতীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা আরব অঞ্চলের উন্নতমানের পশম ও সুতা ব্যবহার করে অত্যন্ত সুন্দর পাটি ও কার্পেট তৈরি করতেন।
এছাড়া Maysan অঞ্চলেও উচ্চমানের কার্পেট ও জায়নামাজ তৈরির জন্য সুনাম ছিল। এই অঞ্চলে কার্পেট ছাড়াও রেশমি পর্দা, বিছানার চাদর, গালিচা ও বালিশ তৈরি হতো।
মুসলিম শাসনামলে আরব অঞ্চলে রঙিন ও ছাপা পোশাকের প্রচলন বাড়তে থাকে। এসব পোশাকে ফুল, গাছ, পাখি ও প্রাণীর নকশা ব্যবহার করা হতো, যা শিল্পকলার উন্নত রুচির পরিচয় বহন করত।
বিশেষ করে Mosul অঞ্চলে তৈরি পর্দা ও পাপোস আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হতো। এগুলো আরব ও পাশ্চাত্যের রাজদরবারগুলোতেও বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিল।
অন্যদিকে Faiyum শহর মূল্যবান পর্দা, দীর্ঘ বিছানা এবং পশমের তৈরি তাবুর জন্য বিখ্যাত ছিল। কখনো কখনো এসব পর্দার দৈর্ঘ্য ৩০ গজেরও বেশি হতো এবং মূল্য কয়েকশো স্বর্ণমুদ্রা পর্যন্ত পৌঁছাত।
ইতিহাসবিদ Ibn al-Jawzi তার ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান অঞ্চলের গভর্নর ইউসুফ বিন আবিস-সাজা খলিফা Al-Muqtadir Billah-এর কাছে উপহার হিসেবে বিশাল আকারের বিছানার চাদর পাঠিয়েছিলেন।
এই বিছানার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৭০ গজ এবং প্রস্থ ছিল ৬০ গজ। এটি তৈরি করতে প্রায় ১০ বছর সময় লেগেছিল এবং এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
পরিশেষে বলা যায়, কার্পেট ও জায়নামাজ শিল্প মুসলিম সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। এটি শুধু শিল্পকলার নিদর্শনই ছিল না, বরং সামাজিক মর্যাদা, সৌন্দর্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
ইসলামের আগমনের পর এই শিল্পে নতুন নকশা, কারুকার্য এবং ধর্মীয় গুরুত্ব যুক্ত হয়। এর ফলে কার্পেট ও জায়নামাজ শিল্প বিশ্ববাজারে খ্যাতি অর্জন করে এবং আজও তা ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিল্পকলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।