
বাংলাদেশ, ভারত ও চীনসহ কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সম্ভাব্য অন্যায্য চর্চা খতিয়ে দেখতেই এই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাতিল করার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই তদন্তের আওতায় বাংলাদেশের পাশাপাশি আরও কয়েকটি দেশ রয়েছে। তালিকায় ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, সুইজারল্যান্ড ও নরওয়ের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার কানাডাকে এই তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
গত বুধবার (১১ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানান, সেকশন ৩০১-এর আওতায় শুরু হওয়া এই তদন্তের লক্ষ্য হলো বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যচর্চা পর্যালোচনা করা। তিনি বলেন, তদন্তে যদি কোনো দেশের বিরুদ্ধে অন্যায্য বাণিজ্য কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সেই দেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে আমদানি শুল্ক আরোপ করতে পারে।
গ্রিয়ারের মতে, এই তদন্তের ভিত্তিতে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মেক্সিকোর মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোর ওপরও গ্রীষ্মের মধ্যেই নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তিনি আরও জানান, ট্রাম্প প্রশাসন গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যে অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেছিল, তা আগামী জুলাই মাসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই এই তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আশা করছে মার্কিন প্রশাসন।
কয়েক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানায়, গত বছর এপ্রিলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে শুল্ক আরোপ করেছিলেন তা আইনি বৈধতা পায় না। আদালতের ওই রায়ে বলা হয়, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন প্রেসিডেন্টকে একতরফাভাবে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না।
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, জাতীয় জরুরি পরিস্থিতির জন্য সংরক্ষিত আইন ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, এমন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মূলত কংগ্রেসের হাতে ন্যস্ত।
এই রায়ের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস মন্তব্য করেন, শুল্ক আরোপের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই কংগ্রেসের সুস্পষ্ট অনুমোদন দেখাতে হবে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট এককভাবে এই ধরনের অসাধারণ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন না।
গত বছরের এপ্রিল মাসে ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের নির্দেশ দিয়েছিল। পরে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে যায়, যেখানে নির্ধারিত শুল্কের হার কিছুটা কমানোর পাশাপাশি বাণিজ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন বিধিনিষেধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এসব চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুল্কনীতিতে পরিবর্তন এলেও বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তিগুলো বাতিল হচ্ছে না। ফলে চুক্তির অধীনে যে শর্ত ও সম্মতিগুলো রয়েছে সেগুলো কার্যকর থাকবে বলেই ট্রাম্প প্রশাসন আশা করছে।
এদিকে আদালতের রায়ের পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রয়োজনে এই শুল্ক ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে শুরু হওয়া এই তদন্তের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন তার বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর আরও শক্ত অবস্থান নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। বিশেষ করে শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজেদের স্বার্থকে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বৈঠক আগামী মার্চের শেষ দিকে বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকের পথ প্রস্তুত করতে পারে।