
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে কাতার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলো ইরানের শত্রু নয়। একই সঙ্গে বর্তমান সংকট নিরসনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল আজিজ আল-খুলাইফি বুধবার (১১ মার্চ) আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমিত করতে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং আলোচনার পথই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে।
আল-খুলাইফি বলেন, ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর যে হামলা চালাচ্ছে, তা কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না। তার মতে, এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বোমাবর্ষণের জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব হামলার ফলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি ওই অঞ্চলের জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কাতার ও ওমানসহ কয়েকটি দেশের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এই দেশগুলো এতদিন ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে যোগাযোগের সেতুবন্ধন তৈরি করার চেষ্টা করেছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করেছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো দেশই আক্রান্ত অবস্থায় সেই ভূমিকা পালন করতে পারবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, সংঘাতের পরিবেশে মধ্যস্থতা কার্যকরভাবে চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
আল-খুলাইফি আরও বলেন, কাতার তার সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো ধরনের অন্যায্য হামলার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি এবং আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
তিনি উল্লেখ করেন, কয়েক দিন আগে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জাসিম আল থানি তেহরানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। সেই আলোচনায় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। তবে এরপরও পরিস্থিতিতে আশানুরূপ পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে তিনি জানান।
এই সংঘাতের প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন কাতারের এই প্রতিমন্ত্রী। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বৈশ্বিক পর্যায়ের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ সংঘাতের কারণে এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আল-খুলাইফি বলেন, একটি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করার জন্য সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। তিনি মনে করেন, চলমান সামরিক অভিযান বন্ধ করা এখন সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।
এদিকে কাতার একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখছে। দোহা থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক কূটনৈতিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
কাতার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শত্রুতা পরিহার করে শান্তির পথে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। কাতার আশা করছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো দ্রুত সংঘাত বন্ধের উপায় খুঁজে বের করবে এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে সম্মত হবে।
সাক্ষাৎকারে আল-খুলাইফি আবারও জোর দিয়ে বলেন, ইরানকে বুঝতে হবে যে আঞ্চলিক দেশগুলো তাদের প্রতিপক্ষ নয়। বরং তারা শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতামূলক ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান উত্তেজনা যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়, তাহলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা গুরুতর হুমকির মুখে পড়তে পারে।