
দেশের বাজারে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে নির্মাণশিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল রডের দাম। মাত্র একদিনের ব্যবধানে টনপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগে পড়েছেন আবাসন ও অবকাঠামো খাতের ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু ব্যবসা নয়, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, কিছুদিন আগেও বাজারে প্রতি টন রডের দাম ছিল প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ হাজার টাকার মধ্যে। তবে সোমবার বাজারে একই পণ্য বিক্রি হয়েছে টনপ্রতি ৯০ থেকে ৯১ হাজার টাকায়।
বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রডের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, সিএসআরএম রডের দাম টনপ্রতি প্রায় ৮৪ হাজার টাকা, আনোয়ার ইস্পাতের রড প্রায় ৯০ হাজার টাকা এবং কেএসআরএম ও আকিজের মতো প্রতিষ্ঠানের রড প্রায় ৯১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে রহিম স্টিলের রডের দাম প্রায় ৮৭ হাজার টাকা বা তারও বেশি হয়েছে।
রডের এই মূল্যবৃদ্ধিকে ঘিরে বাজারে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। আবাসন খাতের অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন, ইরান যুদ্ধকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রডের দাম বাড়াচ্ছেন। তাদের মতে, বাজারে যে রড ইতোমধ্যে রয়েছে, তার ওপর সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রভাব পড়ার কথা নয়।
অন্যদিকে রি-রোলিং মিল মালিকরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে সিন্ডিকেটের সুযোগ নেই। বরং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণেই স্থানীয় বাজারে রডের দাম বাড়ছে।
তাদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জাহাজ কোম্পানিগুলো অনেক ক্ষেত্রে বীমা সুবিধা পাচ্ছে না, ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামালের দাম ১৩০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে জ্বালানি খাতে। তবুও জনস্বার্থ বিবেচনায় সরকার দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি। এমন পরিস্থিতিতে তুলনামূলক কম প্রভাব থাকা সত্ত্বেও রডের দাম হঠাৎ করে বাড়া ইতিবাচক সংকেত নয় বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে। তিনি জানান, সরকার সব সময় জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয় এবং বাজারে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেছেন, বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আবাসন খাত। এর মধ্যে হঠাৎ রডের দাম বাড়া ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব রড উৎপাদনে তাৎক্ষণিকভাবে পড়ার কথা নয়। তাই অকারণে দাম বাড়ানো হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বাজারে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট কাজ করছে কি না সেটিও যাচাই করা দরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।
লিয়াকত আলী ভূঁইয়া আরও বলেন, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজার মনিটরিং জোরদার করা জরুরি। সরকার চাইলে রিহ্যাব, এফবিসিসিআই এবং রড ব্যবসায়ী সমিতিকে সঙ্গে নিয়ে যৌথভাবে বাজার পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
তার মতে, আবাসন খাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ খাতে সরাসরি প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পসহ প্রায় এক কোটির বেশি মানুষ এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। ফলে নির্মাণসামগ্রীর দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে শ্রমিক ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষই ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যয় বাড়া, ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহন ব্যয়ের চাপ মিলিয়ে নির্মাণ খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে ধীরগতি দেখা দিতে পারে।