
যশোরে তিনটি আদালত বর্জনের সিদ্ধান্তে অনড় অবস্থানে রয়েছেন জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যরা। তাদের এই অবস্থানের ফলে আদালতের স্বাভাবিক বিচার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং বিচারপ্রার্থীরা চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। আইনজীবী সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজকে বদলি না করা পর্যন্ত তারা আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেবেন না।
সোমবার (৯ মার্চ) দুপুরে যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির এক নম্বর ভবনের সেমিনার কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সমিতির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু।
তিনি বলেন, ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ আইরিন পারভীনের আদালত বর্জনের পরও পরিস্থিতির কোনো সমাধান হয়নি। বরং আইনজীবীদের উপস্থিতি ছাড়াই বিচারক বাদী ও আসামিপক্ষের স্বজনদের নিয়ে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে, এতে বিচারপ্রার্থীরা প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পাবলিক প্রসিকিউটর আরও বলেন, জামিন দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আইনজীবীদের আপত্তি নেই। তবে সংশ্লিষ্ট বিচারক আইনগত বিষয়গুলো যথাযথভাবে পরিচালনা করতে পারছেন না—এমন অভিযোগ আইনজীবীদের মধ্যে রয়েছে। এ কারণে সমিতিতে একাধিক অভিযোগ জমা পড়ে এবং পরে বিচারকের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে আদালত বর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এ বিষয়ে বিচারকের সঙ্গে আইনজীবী সমিতির বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই বৈঠকে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ মার্চ জরুরি সভা করে সর্বসম্মতিক্রমে ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ আইরিন পারভীনের দুটি আদালত এবং যুগ্ম জেলা জজ রাশেদুর রহমানের আদালত বর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আইনজীবী সমিতির নেতারা অভিযোগ করেন, আদালত বর্জনের পরও সংশ্লিষ্ট বিচারক আইনজীবীদের অনুপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মতে, এটি প্রচলিত বিচারিক রীতিনীতির পরিপন্থি।
আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজকে সরিয়ে অন্য কোনো বিচারককে দায়িত্ব দেওয়া হলে তারা আদালতের কার্যক্রমে ফিরে আসবেন। তবে এখন পর্যন্ত বিচার বিভাগ থেকে এ বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে তারা দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জাহেদ আহমদ বারের সঙ্গে সমন্বয় না করেই এজলাসের কার্যক্রম শুরুর সময় পরিবর্তন করেছেন, যা নিয়েও আইনজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সমস্যা সমাধানে আইনমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন আইনজীবীরা।
একই সঙ্গে আগামী বুধবার জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে। আইনজীবী সমিতি আশা করছে, দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হলে বিচারাঙ্গনের চলমান সংকটের সমাধান সম্ভব হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী দেবাশীষ দাস, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এম এ গফুর, সাবেক সভাপতি এম ইদ্রিস আলী, শরীফ নুর মোহাম্মদ আলী রেজা, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম বাচ্চু এবং মঈনুল হক খান ময়না।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, যশোরের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ নাজমুল আলম গত বছরের ২৮ আগস্ট বদলি হন। পরে ৫ নভেম্বর মোহাম্মদ আলী দায়িত্ব নিলেও চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি তিনিও বদলি হন। এরপর জেলা জজের পদ শূন্য থাকায় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজদের মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।
সম্প্রতি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এম এম মোর্শেদের বদলির পর আইরিন পারভীনকে ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলে আইনজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। সেই অসন্তোষই পরবর্তীতে আদালত বর্জনের সিদ্ধান্তে রূপ নেয় এবং বর্তমানে যশোরের বিচারাঙ্গনে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।