
রমজান মাসে সৌদি আরবে সামাজিক জীবনযাত্রায় একটি নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবে ইফতারকে কেন্দ্র করে সামাজিক আড্ডা ও পারিবারিক মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হলেও বর্তমানে অনেকের কাছে গভীর রাতের সেহরি সময়টিই হয়ে উঠছে সামাজিক যোগাযোগের প্রধান মুহূর্ত।
ফলে মধ্যরাতের পর থেকে ফজর পর্যন্ত সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং মুদি দোকানগুলোতে উল্লেখযোগ্য ভিড় দেখা যাচ্ছে। অনেক জায়গায় রেস্তোরাঁগুলো ভোর পর্যন্ত খোলা রাখা হচ্ছে এবং ক্যাফেগুলোতেও রাত গভীর হওয়ার পর থেকেই ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়তে থাকে।
ঐতিহ্যগতভাবে ইফতারের সময় নির্দিষ্ট। মাগরিবের নামাজের সময় ইফতার করা হয় এবং সেই সময়কে ঘিরেই পরিবারের সদস্যরা একত্র হন। কিন্তু এখন অনেক সৌদির কাছে ভোরের আগের সময়টি হয়ে উঠছে বেশি আবেগঘন ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়। বরং শহুরে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, কর্মসূচির ধরন এবং রমজানে রাতজাগা সংস্কৃতির বিস্তারের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
আলখোবার শহরের তিন সন্তানের মা মাহা আল-জাহরানি বলেন, ইফতার অনেকটা দায়িত্বের মতো মনে হয়। নির্দিষ্ট সময়ে টেবিলে বসতে হয় এবং সবকিছু আগে থেকে প্রস্তুত রাখতে হয়। কিন্তু সেহরির সময়টা অনেক শান্ত এবং সেখানে তাড়া থাকে না। পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘ সময় বসে গল্প করতে পারেন।
অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে ইফতারের আয়োজন আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয়। কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই খাবার প্রস্তুত করা হয় এবং অতিথিরা সূর্যাস্তের কিছু আগে এসে পৌঁছান। সবকিছু নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে সম্পন্ন হয়।
অন্যদিকে সেহরি অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত। কেউ বাড়িতে সেহরি করেন, আবার কেউ ক্যাফে বা রাতজাগা ডিনারে গিয়ে খাবার খান। অনেক সময় ভারী খাবারের বদলে ডিম, দই, ফল বা কফির মতো হালকা খাবারেই সেহরি সম্পন্ন করা হয়।
দাম্মামের একটি রাতের খাবারের দোকানে কাজ করা ইউসুফ আল-আনাজি বলেন, সেহরির সময় ক্রেতারা অনেকক্ষণ বসে থাকেন। ইফতারের সময় মানুষ দ্রুত খাবার শেষ করে চলে যান। কিন্তু সেহরিতে তারা গল্প করেন এবং কেউ কেউ ফজরের নামাজের সময় পর্যন্ত ক্যাফেতে বসে থাকেন।
রমজান মাসে সৌদি আরবে খুচরা বাজার এবং ই-কমার্সেও কেনাকাটা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীদের মতে, এটি বছরের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্য মৌসুম।
এই নতুন প্রবণতার কারণে সৌদি আরবে রাতের জীবনযাত্রাও আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইফতারের পরও দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন সামাজিক আয়োজন চলতে থাকে।
সৌদি শ্রম আইনে রমজান মাসে মুসলিম কর্মীদের কাজের সময় সাধারণত কমিয়ে দেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজের সময়সূচি সকালের শেষ ভাগ থেকে দুপুর পর্যন্ত সীমিত থাকে। ফলে সন্ধ্যার পর অনেকেই তুলনামূলকভাবে অবসর সময় পান।
অনেকেই সূর্যাস্ত থেকে তারাবির নামাজ পর্যন্ত সময় পারিবারিক দায়িত্ব, কাজ এবং বিভিন্ন সামাজিক আমন্ত্রণ সামলে নেন। এরপর মধ্যরাত পর্যন্ত সক্রিয় থাকেন।
তরুণদের কাছে সেহরি আড্ডা বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। হাইস্কুল শিক্ষার্থী রাকান আল-শেহরি বলেন, তিনি ইফতার পরিবারের সঙ্গে করেন, কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করেন সেহরির সময়। তখন তারা স্বচ্ছন্দে গল্প করতে পারেন।
ক্যাফেগুলোতে রাত ১১টার পর থেকেই মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। অনেক জায়গায় সেহরির জন্য বিশেষ মেনুও চালু করা হয়েছে, যেখানে এমন খাবার রাখা হয় যা দীর্ঘ সময় রোজা রাখার জন্য উপযোগী।
এই প্রবণতার অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু রেস্তোরাঁতেই সীমাবদ্ধ নয়। সেহরির আগ পর্যন্ত ডেলিভারি অ্যাপগুলো সক্রিয় থাকে এবং মুদি দোকানগুলোতেও ক্রেতাদের ভিড় দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নগরগুলোতে নতুন মিশ্র ব্যবহারভিত্তিক এলাকা এবং রাতকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক অঞ্চলের বিস্তারের ফলে সেহরি ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর রাতভিত্তিক জীবনধারার অংশ হয়ে উঠছে।
তবে এই পরিবর্তন ইফতারের ধর্মীয় গুরুত্বকে কমিয়ে দিচ্ছে না। বরং সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দুটি কিছুটা সরে গিয়ে নতুনভাবে জায়গা করে নিচ্ছে সেহরি।
সূত্র: আরব নিউজ