
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির অর্থ সরাসরি তাদের মায়ের নামে নিবন্ধিত মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সোমবার (৯ মার্চ) ‘প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা, ২০২৬’ জারি করেছে। এই নির্দেশিকায় উপবৃত্তি বিতরণে ডিজিটাল পদ্ধতি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় জিটুপি (Government to Person) পদ্ধতির মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা সরাসরি মায়েদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে। তবে কোনো শিক্ষার্থীর মা না থাকলে সেই ক্ষেত্রে বাবা অথবা বৈধ অভিভাবক এই সুবিধা পাবেন।
সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করা। পাশাপাশি উপবৃত্তি বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয় এবং শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই উপবৃত্তির আওতায় আসবে। তবে একটি পরিবারের সর্বোচ্চ দুইজন শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাবে।
উপবৃত্তির অর্থ দিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ যেমন—স্কুল ব্যাগ, ছাতা, পোশাক, জুতা এবং টিফিন বক্স কিনতে পারবে।
নির্দেশিকায় শ্রেণিভেদে উপবৃত্তির নির্দিষ্ট হারও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী মাসিক ৭৫ টাকা করে উপবৃত্তি পাবে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী মাসিক ১৫০ টাকা পাবে এবং একই পরিবারের দুইজন শিক্ষার্থী থাকলে মাসিক ৩০০ টাকা বরাদ্দ থাকবে।
এছাড়া যেসব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চালু রয়েছে, সেসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাসিক ২০০ টাকা উপবৃত্তি পাবে। একই পরিবারের দুইজন শিক্ষার্থী হলে তাদের জন্য মাসিক ৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
উপবৃত্তি পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের কিছু শর্তও মানতে হবে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে কমপক্ষে ৮০ শতাংশ দিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকতে হবে।
এছাড়া দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আগের শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় প্রতিটি বিষয়ে অন্তত ৪০ শতাংশ নম্বর অর্জন করতে হবে। তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য এই শর্ত কিছুটা শিথিল করা হয়েছে এবং তাদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।
কোনো শিক্ষার্থী যদি টানা তিন মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে তার উপবৃত্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হবে বলে নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
উপবৃত্তি বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীর মাকে প্রধান অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হবে। মায়ের অনুপস্থিতিতে বাবা এবং উভয়ের অনুপস্থিতিতে বৈধ অভিভাবকের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টে এই অর্থ পাঠানো হবে।
এই সুবিধা পেতে হলে শিক্ষার্থীর অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং অভিভাবকের জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
পুরো কার্যক্রমটি ডিজিটাল পদ্ধতিতে তদারকি করবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু থাকবে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে উপবৃত্তি বিতরণের তথ্য রিয়েল টাইমে ট্র্যাক করা সম্ভব হবে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তুলবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, উপবৃত্তি বিতরণে কোনো ধরনের আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতি হলে তা প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।