
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে এশিয়ার বাজার খোলার পরই অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত লাফিয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই—দুই বেঞ্চমার্ক তেলের দামই ১১৫ ডলারের ঘরে পৌঁছে যায়, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইল উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ-শঙ্কার কারণে তেলের দামে এই উল্লম্ফন দেখা যায়। এক প্রতিবেদনে ব্রেন্টের দাম ১১৪ দশমিক ৩৬ ডলার এবং মার্কিন ক্রুডের দাম ১১৫ দশমিক ১১ ডলারে ওঠার কথা বলা হয়েছে। অন্য এক প্রতিবেদনে ব্রেন্ট সর্বোচ্চ ১১৭ দশমিক ১৬ ডলার পর্যন্ত ছুঁয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ বাজারে বড় ধরনের ভোলাটিলিটি দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দামের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটগুলোর একটি এই প্রণালি। এখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া, ইউরোপ এবং আমদানিনির্ভর বহু দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা চাপে পড়বে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরাক ও কুয়েতের মতো কিছু উৎপাদক ইতোমধ্যে উৎপাদন কমিয়েছে, আর এ কারণেই বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে এশিয়ার শেয়ারবাজারে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, জাপানের নিক্কেই সূচক ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নেমে গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার বাজার ৮ শতাংশের বেশি পড়ে গেছে, আর বিস্তৃত এশীয় বাজার সূচকও বড় চাপের মুখে রয়েছে। ভারতের নিফটি ৫০ সূচক ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং সেনসেক্স ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ কমে দিনের লেনদেন শুরু করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে আতঙ্ক এতটাই বাড়ে যে সেখানে সাময়িকভাবে ‘সার্কিট ব্রেকার’ চালু করতে হয়। এটি সাধারণত তখনই প্রয়োগ করা হয়, যখন অতিরিক্ত বিক্রির চাপ বাজারকে অস্বাভাবিকভাবে নিচের দিকে ঠেলে দেয়। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা যুদ্ধের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও এই পরিস্থিতি বড় সতর্কসংকেত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের গবেষণা অনুযায়ী, তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে পরের বছরে বৈশ্বিক উৎপাদন ০.১৫ শতাংশ কমে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ জ্বালানি দামের এই ধাক্কা শুধু তেল আমদানিকারক দেশ নয়, প্রায় সব অর্থনীতির জন্যই চাপ তৈরি করতে পারে।
রয়টার্স আরও বলছে, বাজার এখন আশঙ্কা করছে যে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। এই পরিস্থিতিতে জেট ফুয়েল, সার উৎপাদনের কাঁচামাল, পরিবহন ব্যয় এবং শিল্প উৎপাদনের খরচ—সবকিছুর ওপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে এশিয়ার অর্থনীতিগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল, তারা এই ধাক্কা আগে ও বেশি অনুভব করতে পারে।
সব মিলিয়ে, তেলের দাম এখন ১১৫ ডলারের ঘরে ওঠায় বৈশ্বিক বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংঘাত যদি দ্রুত না থামে, তাহলে সামনে আরও মূল্যবৃদ্ধি, বেশি মুদ্রাস্ফীতি এবং শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা দেখা যেতে পারে।