
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর সংখ্যা কাগজে দ্বিগুণ দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়ভাবে ৫০ শয্যার এই হাসপাতালটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দাপ্তরিক হিসাব অনুযায়ী রোগীর সংখ্যা বেশি দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক শয্যাই খালি পড়ে আছে।
গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সকাল ১১টার দিকে হাসপাতালটিতে গিয়ে দাপ্তরিক নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত ৩ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিনই ৫০ জন করে রোগী ভর্তি দেখানো হয়েছে। ৪ মার্চ রোগীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৪৫ জন এবং ৫ মার্চ ৪৩ জন।
কিন্তু হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, বাস্তবে এত রোগী নেই। অনেক শয্যাই ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। অথচ সেদিনের সরকারি তালিকায় ৪৩ জন রোগী ভর্তি থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তব চিত্রের সঙ্গে এই হিসাবের বড় ধরনের অমিল রয়েছে।
এ সময় হাসপাতালে থাকা কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলা হলে তারা জানান, সাধারণত হাসপাতালে রোগীর চাপ খুব বেশি থাকে না। তবে কাগজপত্রে রোগীর সংখ্যা বেশি দেখানোর বিষয়টি তারা আগে জানতেন না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ভর্তি হওয়া প্রত্যেক রোগীর জন্য নির্দিষ্ট খাদ্য বরাদ্দ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে পাঁচ দিন দুই বেলা ১২৮ গ্রাম করে মাছ বা মুরগির মাংস দেওয়ার কথা। বাকি দুই দিন ডিম বা মাছ সরবরাহ করার বিধান রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে রোগীদের অভিযোগ, দুই বেলাতেই তারা ৫০ গ্রামের বেশি মাছ বা মাংস পান না। বাজারে মাছের দাম বেশি হওয়ায় প্রায়ই মাছের পরিবর্তে ব্রয়লার মুরগি দেওয়া হয়।
দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে একজন রোগীর জন্য প্রতিদিনের খাবার বাবদ বরাদ্দ রয়েছে ১৭৫ টাকা। এর মধ্যে সকালের নাশতা, দুপুর ও রাতের খাবার অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ দিবসে এই বরাদ্দ বেড়ে ২০০ টাকায় দাঁড়ায়।
নিয়ম অনুযায়ী দুপুর ও রাতে ২৮-ইরি চালের ৩৩০ গ্রাম করে ভাত দেওয়ার কথা থাকলেও রোগীদের অভিযোগ, সেখানে নিম্নমানের স্বর্ণা ইরি চাল দেওয়া হচ্ছে। ডাল দেওয়া হয় খুবই পাতলা এবং মাঝে মাঝে সামান্য সবজি দেওয়া হয়।
সকালের নাশতায় নিয়ম অনুযায়ী দুই পিস পাউরুটি, একটি সেদ্ধ ডিম এবং একটি পাকা শবরি কলা দেওয়ার কথা। কিন্তু রোগীদের দাবি, দেওয়া পাউরুটি নিম্নমানের এবং কলার আকারও ছোট। অনেক সময় রান্নার মান এতটাই খারাপ হয় যে রোগীরা তা খেতে আগ্রহী হন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন রোগী ও স্বজন জানান, দুপুরে দেওয়া মোটা চালের ভাত অনেক সময় খাওয়ার উপযোগী থাকে না। ডাল পানির মতো পাতলা। মাছ প্রায় দেওয়া হয় না বললেই চলে। ১৫ দিনের মধ্যে একদিনও মাছ পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
এ বিষয়ে নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মশিউর রহমান বলেন, খাবারের বিষয়টি ঠিকাদার দেখেন এবং রোগী ভর্তির বিষয়টি হাসপাতালের আরএমও দেখেন।
অন্যদিকে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. মোস্তাফা কায়সারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, বিষয়টি তিনি দেখবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালের খাবার সরবরাহের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির নাম ইসতিয়াক কনস্ট্রাকশন। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী হিসেবে রয়েছেন মো. রেজাউল করিম মোল্লা, যিনি উপজেলা পরিষদের কম্পিউটার অপারেটর (সিএ) মো. ইয়াসির আরাফাতের বোনজামাই। তবে স্থানীয়দের দাবি, কার্যত পুরো বিষয়টি পরিচালনা করেন ইয়াসির আরাফাত নিজেই এবং বিলের চেকেও তার স্বাক্ষর থাকে।
এ বিষয়ে ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
পিরোজপুরের জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে জানান।
এদিকে পিরোজপুর জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, সরকারি চাকরিতে থেকে অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো পেশায় যুক্ত থাকার সুযোগ নেই। বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।