
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও নির্ভুল করতে নতুন দুটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর মধ্যে একটি হলো এনআইডিতে নাগরিকের মূল নামের পাশাপাশি ‘ডাক নাম’ যুক্ত করা এবং অন্যটি হলো ভোটার নিবন্ধনের সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার কোনো সম্মানিত ব্যক্তির সুপারিশ বাধ্যতামূলক করা।
নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি উইং) মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, অনেক সময় অপরাধীরা নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে ভুয়া তথ্য দিয়ে এনআইডি তৈরি করার চেষ্টা করে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সমস্যা সমাধানে এনআইডিতে ‘ডাক নাম’ যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন।
মহাপরিচালক জানান, অনেক মানুষ পারিবারিক বা স্থানীয়ভাবে একটি ভিন্ন নামে পরিচিত থাকেন। কিন্তু এনআইডিতে সাধারণত কেবল তাদের আনুষ্ঠানিক নামই উল্লেখ থাকে। ফলে কোনো ব্যক্তি যদি তার আসল পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করেন, তাহলে তাকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়।
তিনি বলেন, “এনআইডিতে ডাক নাম যুক্ত করার ব্যবস্থা চালু হলে কোনো ব্যক্তি সহজে নিজের পরিচয় গোপন করতে পারবে না। এতে নাগরিক শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া আরও নির্ভুল হবে।”
নির্বাচন কমিশন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তা হলো ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার কোনো বিশিষ্ট বা সম্মানিত ব্যক্তির সুপারিশ বাধ্যতামূলক করা।
এ বিষয়ে মহাপরিচালক জানান, নিবন্ধন ফরম-২ তে একটি বিশেষ ঘর যুক্ত করা হবে, যেখানে আবেদনকারীর পরিচয় যাচাই করে এলাকার কোনো সম্মানিত ব্যক্তি সুপারিশ করবেন।
তিনি বলেন, “স্থানীয়ভাবে পরিচিত কোনো ব্যক্তির সুপারিশ নেওয়া হলে বিদেশি নাগরিক বা রোহিঙ্গাদের পক্ষে বাংলাদেশি ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।”
তার মতে, স্থানীয় প্রতিনিধি বা এলাকার পরিচিত ব্যক্তিরা সহজেই বুঝতে পারবেন আবেদনকারী ওই এলাকার বাসিন্দা কি না। ফলে ভুয়া তথ্য দিয়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ কমে যাবে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে এনআইডি কার্ডে নাগরিকের নাম, পিতা-মাতার নামসহ কিছু মৌলিক তথ্য সংরক্ষিত থাকে। তবে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে পরিচিত নাম বা ডাক নাম ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত থাকে না।
এই নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এনআইডি ডাটাবেজ আরও সমৃদ্ধ হবে এবং একজন নাগরিকের পরিচয় যাচাই করা সহজ হবে।
একই সঙ্গে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমেও স্বচ্ছতা বাড়বে বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন।
বিশেষ করে বিদেশি নাগরিক বা রোহিঙ্গাদের ভুয়া তথ্য দিয়ে ভোটার হওয়ার অভিযোগ অতীতে বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
কর্মকর্তারা আশা করছেন, স্থানীয়ভাবে পরিচিত কোনো সম্মানিত ব্যক্তির সুপারিশ বাধ্যতামূলক করা হলে এ ধরনের জালিয়াতি অনেকটাই কমে আসবে।
নির্বাচন কমিশনের এই নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এনআইডি ব্যবস্থাপনায় আরও নির্ভুলতা ও স্বচ্ছতা আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে পরিকল্পনাটি কার্যকর করার আগে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন এবং প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় পরিচয়পত্র বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল। ব্যাংকিং, সরকারি সেবা গ্রহণ, পাসপোর্ট তৈরি এবং ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এনআইডি অপরিহার্য। তাই এর তথ্যভান্ডার যত নির্ভুল হবে, প্রশাসনিক কার্যক্রম তত সহজ ও কার্যকর হবে।