
নেপালের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোকে পেছনে ফেলে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তরুণ নেতা বালেন্দ্র শাহ। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পার্লামেন্টে প্রবেশ করতে যাচ্ছে এবং দলটির নেতা বালেন্দ্র শাহ দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে এগিয়ে আছেন।
নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করেছিলেন যে, এবার নেপালের ভোটে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই পূর্বাভাসই সত্যি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসা প্রথাগত দলগুলোকে অনেক ভোটারই প্রত্যাখ্যান করেছেন।
নেপালের এই নির্বাচনে জেন-জি প্রজন্মের ভোটারদের বড় ভূমিকা ছিল। তরুণ ভোটারদের সমর্থনই বালেন্দ্র শাহকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের আকাঙ্ক্ষা ও পরিবর্তনের প্রত্যাশা এই নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলেছে।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, নেপালের সাধারণ ভোটাররা পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে নতুন নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকেছেন। সেই সুযোগেই এগিয়ে আসে আরএসপি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নেপালের পার্লামেন্টে ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতিতে ১৬৫টি আসন এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে ১১০টি আসনের ফলাফল আগামী সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হবে।
বালেন্দ্র শাহর রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে ছিল সুপরিকল্পিত একটি প্রচারণা কৌশল। পশ্চিম কাঠমান্ডুর একটি ছয়তলা ভবন থেকে শুরু হয়েছিল তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার পরিকল্পনা।
রয়টার্স জানিয়েছে, বালাজু এলাকায় অবস্থিত আরএসপির সদর দপ্তরের ওপরের তিনটি তলা থেকেই মূল প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সেখানে দলটির গবেষণা, কৌশল ও ডকুমেন্টেশন বিভাগ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
এই বিভাগের অধীনে ১১ সদস্যের একটি বোর্ডের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৩০০ জন কর্মী তিনটি দলে ভাগ হয়ে কাজ করেন। তারা নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ, সমাবেশ আয়োজন, অনলাইন প্রচারণা পরিচালনা এবং সারা দেশ থেকে ভোটারদের মতামত সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন।
আরএসপির প্রচারণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল গণমাধ্যম কৌশল। বালেন্দ্র শাহ পরিকল্পিতভাবে প্রতি আট দিনে একটি বড় ভাষণ দিতেন। এই ভাষণগুলো ৬৬০ সদস্যের একটি সোশাল মিডিয়া টিমের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হতো।
এ ছাড়া দলটি প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাতটি জেলায় রোড শো আয়োজন করত। একই দিনে নেপালের সাতটি প্রদেশের কোনো একটি এলাকায় গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করতেন শাহ।
দলটির এক নেতা জানান, প্রচারণার সময় তারা একটি ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করেছিলেন। বিরোধী দলগুলোকে আগে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বক্তব্য দিতে দেওয়া হতো এবং পরে একবারেই স্পষ্টভাবে জবাব দেওয়া হতো, যাতে বার্তাটি মানুষের কাছে পরিষ্কারভাবে পৌঁছে যায়।
প্রচারণার অর্থায়নেও ভিন্নতা ছিল। আরএসপির নেতারা জানিয়েছেন, নির্বাচনী প্রচারণার বড় অংশের অর্থ এসেছে বিদেশে বসবাসরত নেপালি প্রবাসীদের কাছ থেকে।
রাজনীতিতে আসার আগে বালেন্দ্র শাহ ছিলেন রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়র। ২০২২ সালে তিনি এই পদে নির্বাচিত হন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি নেপালের একজন জনপ্রিয় র্যাপ শিল্পী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর লাখ লাখ অনুসারী ছিল, যা নির্বাচনী প্রচারণায় বড় ভূমিকা রাখে।
বালেন্দ্র শাহ এবার ঝাপা-৫ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেন। এটি তেরাই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন, যা দীর্ঘদিন ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল।
প্রচারণার সময় শাহ সংবাদমাধ্যমে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার দেওয়ার পরিবর্তে সরাসরি মানুষের সঙ্গে কথা বলাকে বেশি গুরুত্ব দেন। পথ চলতে চলতে হঠাৎ থেমে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে আলাপ করতেন তিনি।
একই সঙ্গে তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়, যারা ভোটারদের মতামত সংগ্রহ ও প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আরএসপির নেতারা জানিয়েছেন, বালেন্দ্র শাহর সম্ভাব্য সরকার প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করতে চায়। পাশাপাশি তরুণদের সম্পৃক্ততা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের এই নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিতই নয়, বরং তরুণ নেতৃত্ব ও নতুন ধরনের প্রচারণা কৌশলের সাফল্যেরও একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: রয়টার্স