
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে লক্ষ্য করে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা বা আলোচনা করার বিষয়ে তার আগ্রহ নেই।
শনিবার (৭ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি উড়োজাহাজ এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। তিনি জানান, ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত বা দেশটির বর্তমান নেতৃত্ব ক্ষমতা থেকে সরে না যাওয়া পর্যন্ত এই সংঘাত থামার সম্ভাবনা নেই বলে তিনি মনে করেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে ইরানের নেতৃত্ব আত্মসমর্পণ করার মতো অবস্থাতেও থাকবে না।
এদিকে যুদ্ধের পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এবং অনুরোধ জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় যেন তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া না হয়।
তবে প্রেসিডেন্টের এ মন্তব্যকে দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন ইরানের কট্টরপন্থী নেতারা। তারা তার বক্তব্যের সমালোচনা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে সামরিক দিক থেকেও সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধফরা বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের রিভোলিউশনারি গার্ড।
একই সময়ে ইসরায়েলের হাইফা তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলও পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা এবং কমান্ড সেন্টারে হামলার খবরও পাওয়া গেছে।
এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীরও ক্ষয়ক্ষতির খবর এসেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, সংঘাতের মধ্যে অন্তত ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
এদিকে লেবানন ও ইরানে শত শত বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। মানবিক সংকটের আশঙ্কাও বাড়ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।
বহু বছরের রেকর্ড ভেঙে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে কুয়েত ও ইরাক থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য, পরিবহন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়বে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহল যুদ্ধ থামানোর জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও মাঠপর্যায়ে সংঘাত কমার কোনো লক্ষণ এখনও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।