
একসময় নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অনেক দেশ অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হিসেবে দেখত। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণার তথ্য বলছে, সেই অগ্রগতির ধারায় এখন কিছুটা ভাটা পড়েছে। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কমছে, উচ্চশিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ছে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বেও নারীর উপস্থিতি কমে এসেছে। পাশাপাশি নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে বাল্যবিয়ের হার।
এমন বাস্তবতার মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ সব নারীর জন্য হোক’। দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বাণীতে দেশের নারীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলাই লক্ষ্য, যেখানে নারী ও পুরুষ সমান অধিকার ভোগ করবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে শ্রমশক্তির মোট সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কমেছে। ২০২৪ সালে মোট শ্রমশক্তি ছিল প্রায় ৭ দশমিক ১৭ কোটি, যেখানে আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৭ দশমিক ৩৪ কোটি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শ্রমশক্তি প্রায় ১৭ লাখ কমেছে, যার বড় অংশই নারী শ্রমশক্তি হ্রাসের কারণে হয়েছে বলে বিশ্লেষণে দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক চাপ, মাতৃত্বকালীন ছুটির পর কর্মস্থলে ফিরতে না পারা, নিরাপদ ও সহজলভ্য যানবাহনের অভাব এবং কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি—এসব কারণ নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ কমিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চ পদ, দক্ষ পেশা, গবেষণা ও সৃজনশীল কাজেও নারীর উপস্থিতি এখনও সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার দিকে আরও বেশি করে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি যারা উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর বিয়ে ও সন্তান লালনপালনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাদেরও কর্মক্ষেত্রে ফিরতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। কর্মজীবী মায়েদের জন্য ডে-কেয়ার সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে একসময় নারী শ্রমিকের আধিপত্য ছিল। এ খাতে মোট শ্রমিকের ৮০ শতাংশের বেশি নারী ছিলেন। তবে বর্তমানে এ খাতে নারীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক নারী পোশাক কারখানার চাকরিকে আগের মতো আকর্ষণীয় মনে করছেন না।
শিক্ষাক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের সংখ্যা ছেলেদের তুলনায় বেশি হলেও উচ্চশিক্ষায় এসে সেই অনুপাত কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক স্তরে ছাত্রীর হার ৫১ দশমিক ২১ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে তা বেড়ে ৫৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তবে উচ্চমাধ্যমিকে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ৭৫ শতাংশে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪৭ শতাংশ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রীর অনুপাত প্রায় ৪৮ শতাংশ হলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তা আরও কম। কারিগরি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
রাজনীতিতেও নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। নির্বাচনে ৮৫ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র সাতজন।
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে একশনএইড বাংলাদেশ এক অনুষ্ঠানে জানায়, গত ২৫ বছরের মধ্যে বর্তমানে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ সবচেয়ে কম। সংস্থাটির মতে, নির্বাচনি ব্যবস্থায় কাঠামোগত বাধা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং সাইবার বুলিং নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এদিকে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনাও বাড়ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের ইউএনএফপিএর বৈশ্বিক জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২৫ বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ৫১ শতাংশ মেয়ের বিয়ে ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই হয়ে যায়। অল্প বয়সে মা হওয়ার কারণে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, গত দেড় বছরে নারীবিরোধী সংস্কৃতির কিছু প্রবণতা দেখা গেছে, যা নারীর ক্ষমতায়নের ওপর প্রভাব ফেলেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকার নারীবান্ধব নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে।
নারী অধিকার সংগঠন নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও অন্তর্বর্তী সরকারের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক বলেন, ‘ক্ষমতায়ন’ শব্দটির অনেক ক্ষেত্রে অপব্যবহার হচ্ছে। শুধু চাকরি পাওয়া বা বেতন বৃদ্ধি হওয়াকেই ক্ষমতায়ন হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তার মতে, নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন বলতে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হওয়াকে বোঝায়।
তিনি আরও বলেন, নারীকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে সম্মান করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে এবং সমাজের সব স্তরে নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। তখনই প্রকৃত অর্থে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে।