
জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আয়োজিত আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আলোচনা সভায় নারী নেত্রীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যে জুলাই গণ-আন্দোলনে নারীরা বিপুল অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ করেছিলেন, আন্দোলনের পর তাদের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি রাষ্ট্র-রাজনীতি, সংস্কার আলোচনা বা সংসদে। সভায় সভাপতিত্ব করেন সিপিবি প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার।
আলোচনাসভার সঞ্চালনা করেন নারী নেত্রী মাহমুদা দীপার। সভায় বক্তৃতা করেন বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, বিশিষ্ট চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. আখতার বানু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দীপ্তি দত্ত, বাংলাদেশ বস্তিবাসী ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট কুলসুম বেগম, বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা লাকি আক্তার এবং সিপিবি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ নারী শাখার সম্পাদক মমতা চক্রবর্তী।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, নারী দিবসের অনুষ্ঠানে আমরা অবশ্যই নির্যাতনের কথাও তুলে ধরব, তবে এটি শুধু পর্যবেক্ষণ নয়; আমাদের দৈনন্দিন শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের সংকট নিরসনের কথাও বলতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যে কথা আমরা দেড় বছর আগে আন্দোলনের মিছিলগুলোতে শুনেছিলাম—বৈষম্য নিরসনের কথা—সেই এজেন্ডা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে আজও রাস্তা-ঘাটে, কর্মক্ষেত্রে এবং পরিবারে বৈষম্য অদূরদর্শীভাবে বিদ্যমান।
সিপিবি প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার বলেন, নারীর সংগ্রাম রাজনৈতিক। আমরা যে বাংলাদেশ চাই, সেটিও একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। নারী মুক্তি, বৈষম্য বিলোপ এবং গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা অপরিহার্য। তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
সভায় অংশ নেওয়া অন্য বক্তারা বলেন, জুলাই গণ-আন্দোলনের নারী অংশগ্রহণ ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের নেতৃত্ব এবং আন্দোলনের অর্জনগুলো রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক পরিসরে দেখা যায়নি। এই অভাব শুধুমাত্র নারী নেত্রীদের অব্যহতি নয়, বরং সমাজে বৈষম্য ও অস্থিরতার পুনরাবৃত্তির প্রতিফলন।
সভায় আরও তুলে ধরা হয়, নারীরা শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনে নয়, দৈনন্দিন জীবনে শিক্ষার, চিকিৎসার ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের উপস্থিতি না থাকার কারণে নারী-বিরোধী বৈষম্য ও সামাজিক অনিশ্চয়তা অক্ষত রয়েছে।
সিপিবি নেতৃত্বের বক্তব্য অনুযায়ী, নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পাশাপাশি বিকল্প শক্তি গড়ে তোলা এবং সামাজিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন। নারী নেত্রীরা শুধুমাত্র স্মৃতিচারণ বা শোভা মিছিলের অংশ নয়; তাদের সক্রিয় নেতৃত্ব ও নীতি প্রণয়নে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহারে, সিপিবি সভা থেকে নারী নেত্রীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়, তারা যেন নিজেরা আন্দোলনের অংশ ও নেতৃত্ব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে সমাজের প্রতিটি স্তরে নারী বৈষম্য নির্মূল ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সক্রিয় থাকে। সভা থেকে এটিও স্পষ্ট হয়েছে, নারী আন্দোলনের অর্জন সংরক্ষণ এবং তার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।