
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ মৃত জেলিফিশ ভেসে আসতে দেখা যাচ্ছে। সৈকতের নানা স্থানে শত শত জেলিফিশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় মাছ ধরা নিয়ে চরম সমস্যায় পড়েছেন স্থানীয় জেলেরা। পাশাপাশি সামুদ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা।
শুক্রবার (৬ মার্চ) দুপুরে কুয়াকাটার তিন নদীর মোহনা, চর বিজয়, গঙ্গামতির চর, লেম্বুর বন, কাউয়ার চর এবং ফাতরার বনসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যক মৃত জেলিফিশ সৈকতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের মতে, এভাবে একসঙ্গে এত বেশি জেলিফিশ ভেসে আসার ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না।
স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এর আগেও চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে কয়েকদিন ধরে কুয়াকাটার উপকূলে জেলিফিশ ভেসে এসেছিল। তবে এবার সংখ্যা ও আকারে তা অনেক বেশি বলে দাবি করেছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার ট্রলার এবং মা-চিংড়ি ধরার ট্রলিং জাহাজের জালে আটকা পড়ে বিপুল পরিমাণ জেলিফিশ মারা যেতে পারে। এরপর সেগুলো জোয়ারের পানির সঙ্গে ভেসে উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় চলে আসছে। এছাড়া সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার পরিবর্তন এবং পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতিও জেলিফিশের অস্বাভাবিক মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
তবে জেলেদের বক্তব্য কিছুটা ভিন্ন। তাদের মতে, সাগরের পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক জেলিফিশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি বয়সের কারণে স্রোতের বিপরীতে চলতে না পারায় অনেক জেলিফিশ মারা যাচ্ছে।
স্থানীয় জেলে রহমান মাঝি জানান, তারা এখন আগের মতো গভীর সমুদ্রে যেতে পারছেন না। কাছাকাছি এলাকা থেকেই মাছ ধরার চেষ্টা করছেন। কিন্তু জেলিফিশের পরিমাণ এত বেশি যে জাল ফেলা ও তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এমনই যে অনেক সময় জাল ফেলেই আবার তীরে ফিরে আসতে হচ্ছে।
আরেক জেলে হেলাল বলেন, জাল তুললেই প্রচুর মৃত জেলিফিশ উঠে আসে। এতে হাত-পা জ্বালা করছে এবং জালেরও ক্ষতি হচ্ছে। তাছাড়া মাছের পরিমাণও কম পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক কেএম বাচ্চু বলেন, অপরিকল্পিত ট্রলিং, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার এবং সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
কুয়াকাটার ডলফিন রক্ষা কমিটির সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, জেলিফিশ সামুদ্রিক খাদ্যচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদের অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে ডলফিনসহ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, সমুদ্রে অতিরিক্ত ট্রলিং, জালের ঘর্ষণ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে জেলিফিশ মারা যেতে পারে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে সাগরে জরিপ চালিয়ে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা হবে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ও সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান গবেষক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা স্বাভাবিক নয়। জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড মিলেই জেলিফিশের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে সৈকতে বিপুল পরিমাণ মৃত জেলিফিশ ভেসে আসায় পর্যটকদের মধ্যেও কিছুটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে কুয়াকাটার সামুদ্রিক পরিবেশের পাশাপাশি পর্যটন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।