
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলের আরবিল শহরে খাদ্যে বিষক্রিয়ায় ফেনীর এক যুবকসহ তিন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ফেনী সদর উপজেলার বাসিন্দা মেহেদী হাসান নাহিদ (২১), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোহাম্মদ তারেক (৪৫) এবং তার ছেলে মো. সাব্বির (২২)।
ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার (৪ মার্চ) আরবিল শহরে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। বাগদাদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসও বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে খাবারের বিষক্রিয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
নিহত মেহেদী হাসান নাহিদ ফেনী সদর উপজেলার শর্শদি ইউনিয়নের দেবীপুর বিসিক শিল্পনগরী সংলগ্ন মৃধা বাড়ির বাসিন্দা মোহাম্মদ মাহবুবুল হকের ছেলে। তিনি ছিলেন তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটানোর আশায় মাত্র পাঁচ মাস আগে প্রবাসে পাড়ি জমান নাহিদ। গত বছরের অক্টোবর মাসে তিনি বাবার সঙ্গে কাজের সন্ধানে ইরাকের আরবিল শহরে যান। পরিবারের আশা ছিল, বিদেশে কাজ করে তিনি পরিবারের ভাগ্য বদলে দেবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই করুণভাবে শেষ হয়ে গেল তার জীবন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ইফতারের পর নাহিদ এবং তার সঙ্গে থাকা আরও তিন বাংলাদেশি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার খবর পেয়ে তাদের দ্রুত স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
সেদিন রাতে ফেনীর মেহেদী হাসান নাহিদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোহাম্মদ তারেক এবং তার ছেলে সাব্বির চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরে যান। পরে তারা সেহরি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।
তবে পরদিন বুধবার সকালে তাদের কোনো সাড়া না পেয়ে স্থানীয়রা বাসায় গিয়ে দেখতে পান তারা আর জীবিত নেই। পরে সেখান থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহতের চাচা মনিরুজ্জামান জানান, পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় প্রায় ১০ লাখ টাকা ঋণ করে নাহিদকে প্রবাসে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ এমন মৃত্যুর ঘটনায় পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছে।
তিনি বলেন, পরিবারের সবাই এই ঘটনায় গভীর শোকে মুহ্যমান। একমাত্র সন্তানের এমন অকাল মৃত্যুতে নাহিদের বাবা-মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
নাহিদের মা হোসনে আরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তিনি শেষবারের মতো তার সন্তানের মুখ দেখতে চান। ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
তিনি আরও বলেন, তাদের পরিবার ইতোমধ্যেই আর্থিকভাবে দুর্বল। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে বড় অঙ্কের ঋণ করতে হয়েছে। এখন তার মরদেহ দেশে আনার জন্যও সহায়তা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুলতানা নাসরিন কান্তা জানিয়েছেন, ঘটনাটি সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা যায়নি। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।
ফেনী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফৌজুল আজিম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে পরে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হবে।
এদিকে প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের আবাসন, খাবার ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে আরও নজরদারি ও সচেতনতা প্রয়োজন।
নাহিদের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবার ও এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারের সদস্যরা এখন অপেক্ষা করছেন, কবে প্রিয় সন্তানের মরদেহ দেশে ফিরবে এবং শেষবারের মতো তাকে বিদায় জানাতে পারবেন।