
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার নিজলাঠিমারা এলাকায় গত রবিবার (১ মার্চ) রাতে ঘটে এক শোকাবহ ঘটনা, যা সমাজে ব্যাপক নিন্দা ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই এলাকায় এক নারী ও তার তিন মাসের শিশুসন্তানকে বর্বরভাবে নির্যাতন করা হয়। রশির গিঁটে তাদের হাত-পা বেঁধে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়। শিশুটিকে আলাদা করে নেওয়া হয়, যা দৃশ্যটিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
ঘটনাটি মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধারণ করা হয় এবং ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ভিডিও এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে পাথরঘাটা আমলি আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা গ্রহণ করেন। পাথরঘাটা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. পনির শেখের নির্দেশে মিস কেসটি রুজু করা হয়।
পাথরঘাটা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মোহাম্মদ মুবিন জানান, ভাইরাল ভিডিওতে এক নারী ও একজন পুরুষকে রশি দিয়ে বেঁধে শারীরিক নির্যাতনের দৃশ্য পাওয়া গেছে। এ সময় নারীর কোলের শিশুসন্তানকে আলাদা করে রাখা হয়। ঘটনাস্থলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির উপস্থিতির বিষয়টিও আদালতের নজরে এসেছে। আদালত প্রাথমিকভাবে শিশু আইন, ২০১৩ এবং দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় অপরাধের উপাদান থাকায় পাথরঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ১০ মার্চের মধ্যে দাখিল করতে হবে। এছাড়া ভাইরাল ভিডিও এবং সংবাদপত্রের কপি সংরক্ষণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর সোমবার (৪ মার্চ) সকালে ওই এলাকায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে এক স্থানীয় ব্যক্তি প্রকাশ্যে ওই নারীকে এলাকা থেকে উৎখাতের হুমকি দেন। সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। মানববন্ধনে পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং বিএনপি নেতা মোহাম্মদ ছগির আলমের সমর্থনে অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করা হয়।
এক ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত মামলার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এছাড়া কয়েকজন বক্তা দাবি করেন, ওই নারীর সঙ্গে তাদের জমিসংক্রান্ত পুরনো বিরোধ রয়েছে। তবে ভুক্তভোগী নারী সাংবাদিকদের জানান, তিনি পূর্বপরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছেন এবং শিশুসন্তানসহ তাকে রশিতে বেঁধে বর্বরভাবে মারধর করা হয়েছে। এসময় প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার কারণে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
স্থানীয় সমাজকর্মী গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘আইনের মধ্যে যার অপরাধ আছে তার বিচার হবে। কোনো চেয়ারম্যান বা তার সমর্থকদের অধিকার নেই কাউকে এলাকা থেকে বিতাড়িত করার।’
পাথরঘাটা থানার ওসি মংচেনলা জানান, আদালতের আদেশ অনুযায়ী বুধবার থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে। ভিডিওতে দৃশ্যমান হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগী নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইনের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে। আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত মামলা বিচারিক প্রক্রিয়াকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।