ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের নির্বাসিত সাবেক যুবরাজ রেজা শাহ পাহলভী। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি খামেনির মৃত্যুকে ইরানের জনগণের জন্য “স্বাধীনতার সুযোগ” হিসেবে উল্লেখ করেন।
নিবন্ধের শুরুতেই পাহলভী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। সম্প্রতি ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে এক বক্তব্যে বলেছিলেন, “তোমাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে।” এই মন্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে পাহলভী বলেন, ইরানের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে যে পরিবর্তনের অপেক্ষায় ছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতি সেই সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে।
রেজা পাহলভী তার লেখায় গত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে চলমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেন। তার দাবি, এই শাসন কেবল ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করা এবং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংঘাতে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, পারমাণবিক অস্ত্র এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টাও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক ছিল।
তবে তার মতে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে দেশের অভ্যন্তরে। বিশেষ করে গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের সময় হাজারো প্রতিবাদকারীকে হত্যার ঘটনাকে তিনি অমানবিক বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, এই ধরনের দমন-পীড়ন ইরানের জনগণের মৌলিক অধিকারকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।
ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে পাহলভী একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবও তুলে ধরেন। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন অপরিহার্য। সেই সংবিধান জনগণের মতামতের ভিত্তিতে গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হওয়া উচিত। এরপর আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে, যাতে জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারে।
নিবন্ধে তিনি আরও লিখেছেন, ইতিহাস খুব কম ক্ষেত্রেই তার মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত আগাম ঘোষণা করে। তবে এমন সময় আসে, যখন সাহস, নেতৃত্ব এবং সংহতি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে। তার মতে, ইরান বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দেশের রাজনৈতিক গতিপথ বদলে যেতে পারে।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই পাহলভী পরিবার দেশের বাইরে অবস্থান করছে। ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার প্রভাব কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিশ্লেষণ চলছে। খামেনির মৃত্যুর পর ক্ষমতার কাঠামো, রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং জনগণের প্রত্যাশা—সবকিছুই নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একদিকে রয়েছে দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার অবসান, অন্যদিকে রয়েছে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা নির্ধারণের প্রশ্ন। এই প্রেক্ষাপটে রেজা পাহলভীর নিবন্ধ নতুন বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা ইরানের পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
