
মহাকাশের গভীর রহস্য উন্মোচনে তিন দশকের বেশি সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে Hubble Space Telescope। ৩৫ বছরে এটি কোটি কোটি ছবি ও বিপুল তথ্য সংগ্রহ করেছে। তবে এত বিপুল ডেটা মানুষের পক্ষে দ্রুত বিশ্লেষণ করা প্রায় অসম্ভব। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবার দেখাল নতুন সম্ভাবনা।
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা-এর গবেষকদের তৈরি একটি নিউরাল নেটওয়ার্কভিত্তিক এআই সিস্টেম হাবলের আর্কাইভে থাকা প্রায় ১০ কোটি ছবি মাত্র ৬০ ঘণ্টায় স্ক্যান করে ১,৩০০টির বেশি অস্বাভাবিক ও বিরল মহাজাগতিক বস্তু শনাক্ত করেছে। সিস্টেমটির নাম ‘AnomalyMatch’। এটি মানুষের মস্তিষ্কের আদলে তৈরি, যা বিশাল ডেটার ভেতর থেকে অস্বাভাবিকতা খুঁজে বের করতে সক্ষম।
হাবল লিগ্যাসি আর্কাইভ জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম বৃহৎ ডেটা ভান্ডার। গ্যালাক্সির বিবর্তন, ব্ল্যাকহোল, মহাকর্ষীয় লেন্সিংসহ নানা জটিল বিষয় নিয়ে গবেষণায় এই আর্কাইভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সমস্যা হলো ডেটার পরিমাণ। কোটি কোটি ছবির মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য বা বিরল গঠন খুঁজে বের করা মানুষের জন্য সময়সাপেক্ষ ও কঠিন।
এআই সিস্টেমটিকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় জেলিফিশ গ্যালাক্সি, গ্র্যাভিটেশনাল আর্ক ও সংঘর্ষরত গ্যালাক্সির মতো বিরল মহাজাগতিক গঠন শনাক্ত করার জন্য। প্রশিক্ষণ শেষে এটি পুরো আর্কাইভ স্ক্যান করে সন্দেহজনক ও অস্বাভাবিক বস্তুগুলোর তালিকা তৈরি করে দেয়।
পরবর্তীতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তালিকাটি যাচাই করে নিশ্চিত হন, শনাক্ত করা বস্তুগুলোর মধ্যে ১,৩০০টির বেশি বাস্তবেই অস্বাভাবিক। এর মধ্যে ৮০০টির বেশি বস্তু আগে কোনো বৈজ্ঞানিক নথিতে উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ এগুলো একেবারেই নতুন পর্যবেক্ষণ।
আবিষ্কৃত বস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে সংঘর্ষরত গ্যালাক্সি—যেখানে দুটি গ্যালাক্সি একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে অদ্ভুত আকৃতি তৈরি করেছে। কিছু গ্যালাক্সিতে দেখা গেছে লম্বা লেজের মতো তারার ধারা, আবার কিছু ক্ষেত্রে গ্যাসীয় শুঁড় বের হয়ে এসেছে, যা দেখতে জেলিফিশের মতো। এছাড়া কয়েক ডজন বস্তু এমন পাওয়া গেছে, যেগুলো এখনো পরিচিত কোনো শ্রেণিতে ফেলা যাচ্ছে না।
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে মহাকাশ গবেষণায় এআই অপরিহার্য হয়ে উঠবে। বিশেষ করে Euclid মিশন এবং Nancy Grace Roman Space Telescope থেকে যে বিপুল পরিমাণ তথ্য আসবে, তা দ্রুত বিশ্লেষণের একমাত্র কার্যকর উপায় হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
তবে গবেষকরা স্পষ্ট করে বলেছেন, এআই জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের প্রতিস্থাপন করছে না। বরং এটি একজন অক্লান্ত সহকারীর মতো কাজ করছে। এআই দ্রুত অস্বাভাবিকতা চিহ্নিত করে দেয়, আর চূড়ান্ত বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত নেন মানুষই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেটার যুগে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নির্ভর করছে বিশ্লেষণের গতির ওপর। এআই সেই গতি এনে দিয়েছে। মানুষের সৃজনশীলতা ও বিচারবুদ্ধির সঙ্গে এআইয়ের প্রসেসিং ক্ষমতার সমন্বয় মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, হাবল টেলিস্কোপের দীর্ঘদিনের আর্কাইভে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য রহস্য এখন দ্রুত উন্মোচিত হওয়ার পথে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতের জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণাকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করে তুলবে—এমনটাই আশা বিজ্ঞানীদের।