
উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেশার এমন একটি শারীরিক সমস্যা, যা অনেক সময় কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ ছাড়াই শরীরের ভেতরে ক্ষতি করে যায়। এ কারণেই একে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। হৃদ্রোগ, স্ট্রোক বা কিডনির জটিলতার মতো বড় ঝুঁকির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও সচেতনতার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপের রোগীরাও রমজানে সুস্থ থেকে রোজা পালন করতে পারেন।
রমজান শুরু হওয়ার আগেই নিজের চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত যেসব ওষুধ খেতে হয়, সেগুলোর সময়সূচি রোজার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের সময় বা ডোজ পরিবর্তন করতে হতে পারে। ইফতার ও সেহরির মধ্যবর্তী সময়ে কোন সময়ে ওষুধ সেবন করলে সবচেয়ে কার্যকর হবে, তা চিকিৎসকই নির্ধারণ করে দেবেন। নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
রোজায় দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর ইফতারে অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত খাবার গ্রহণ রক্তচাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ইফতার শুরু করা উচিত পর্যাপ্ত পানি পান দিয়ে। এতে শরীরের পানিশূন্যতা দূর হয়। চিনি ছাড়া প্রাকৃতিক ফলের রসও গ্রহণ করা যেতে পারে।
খাবারের তালিকায় পটাশিয়ামসমৃদ্ধ ফল ও শাকসবজি রাখা ভালো। কলা, পালং শাক, লাউজাতীয় সবজি ইত্যাদি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। অন্যদিকে অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার যেমন আচার, নোনতা বাদাম বা চিপস এড়িয়ে চলা উচিত। ডুবো তেলে ভাজা ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার রক্তচাপ বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে, তাই এসব সীমিত রাখা জরুরি।
প্রক্রিয়াজাত মাংস যেমন সসেজ বা অতিরিক্ত লবণযুক্ত পনির কম খাওয়াই ভালো। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ, বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ খাওয়া উপকারী হতে পারে। লাল মাংস—গরু বা খাসির মাংস—কম খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। ক্যালসিয়ামের জন্য কম চর্বিযুক্ত দুধ বা দই খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
রমজান জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার একটি ভালো সময়। ধূমপান রক্তচাপ দ্রুত বাড়িয়ে দেয় এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। তাই রমজানকে ধূমপান ছাড়ার সুযোগ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অল্প পরিমাণ ওজন কমলেও রক্তচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম বা নিয়মিত হাঁটাহাঁটি উপকারী। ইফতারের পর বা তারাবির নামাজ আদায়ের সময় শারীরিক নড়াচড়া হয়, যা রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
রোজা অবস্থায় যদি তীব্র মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় করা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দেয়, তবে তা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে রোজা ভেঙে চিকিৎসা নেওয়াও প্রয়োজন হতে পারে—কারণ স্বাস্থ্য সবার আগে।
এ ছাড়া বাড়িতে নিয়মিত রক্তচাপ মাপার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো। এতে নিজের শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন সহজে বোঝা যায় এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
সবশেষে বলা যায়, রোজা শুধু ধর্মীয় অনুশীলন নয়—সচেতনভাবে পালন করলে এটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনারও একটি সুযোগ হতে পারে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে রমজান মাসেও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।