
রমজান মাস এলে তাবলিগ জামাতের বুজুর্গদের জীবনে যেন এক ভিন্ন আবহ নেমে আসত। দুনিয়াবি ব্যস্ততা কমে যেত, বেড়ে যেত কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক, দীর্ঘ নামাজ, নীরবতা, অশ্রুসিক্ত দোয়া এবং মানুষের হেদায়েতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা। তাবলিগ জামাতের প্রাচীন মুরুব্বিদের জীবন থেকে জানা যায়, তাদের কাছে রমজান ছিল আত্মশুদ্ধি ও আত্মগঠনের বিশেষ মৌসুম।
তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা হযরতজি মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) রমজান মাসে অধিকাংশ সময় ইবাদত ও দাওয়াতের কাজে কাটাতেন। শেষ দশকে ইতিকাফে বসেও তিনি শুধু নিজের জন্য নয়, বরং পুরো উম্মাহর জন্য দোয়া করতেন। তাঁর তাহাজ্জুদের নামাজে দীর্ঘ কান্নার কথা কাছের মানুষরা বর্ণনা করেছেন। বলা হয়, তাঁর অশ্রুতে ভেজা দোয়ায় উপস্থিত লোকজনও আবেগ সংবরণ করতে পারতেন না।
দ্বিতীয় হযরতজি মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভী (রহ.) বলতেন, “এই মাসে যদি আমরা বদলাতে না পারি, তাহলে কবে পারবো?” সফরে থাকলেও রমজানে তিনি তিলাওয়াত ও দাওয়াতের কাজ বন্ধ করতেন না। প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় দাওয়াতের কাজ করার পর সাথীরা বিশ্রামের কথা বললে তিনি বলতেন, “রমজান বিশ্রামের জন্য নয়, আখিরাতের পুঁজি জমানোর সময়।” তারাবিহে দীর্ঘ কিরাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছিল তাঁর নিয়মিত অভ্যাস।
শেষ হযরতজি মাওলানা ইনামুল হাসান (রহ.) রমজানে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা প্রায় সম্পূর্ণ বর্জন করতেন। তাঁর ইফতার ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে। অনেক সময় সামনে নানা আয়োজন থাকলেও তিনি খেজুর ও পানি দিয়েই ইফতার করতেন। তাঁর কথা ছিল, “এই মাসে পেটের চাইতে হৃদয় ভরানো জরুরি।”
মাওলানা জাকারিয়া কান্ধলভী (রহ.) অসুস্থ শরীর নিয়েও রমজানে কুরআন ও হাদিস অধ্যয়নে নিমগ্ন থাকতেন। তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা বলেন, রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি হিসাব করে ব্যবহার করতেন। রাত জেগে লেখালেখি ও ইবাদত ছিল তাঁর নিয়মিত আমল।
তাবলিগের বুজুর্গদের রমজানের রাত মানেই তাহাজ্জুদ, দীর্ঘ দোয়া এবং লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান। শেষ দশকে অনেকেই ইতিকাফে বসতেন। মসজিদে নিয়মিত তালিম হতো। তাদের দৃষ্টিতে রমজান শুধু ব্যক্তিগত আমলের সময় নয়; বরং সমাজকে নামাজ, কুরআন ও সুন্নাহর পথে ফেরানোর সুবর্ণ সুযোগ।
রমজানে দরিদ্রদের খোঁজ নেওয়া, গোপনে সাহায্য করা, মুসল্লিদের সঙ্গে সময় কাটানো ছিল তাদের নিয়মিত কাজ। দাওয়াতের সফরেও রোজা, কিয়াম ও তিলাওয়াতে কোনো অবহেলা করতেন না।
তাবলিগের বুজুর্গদের রমজান আমাদের শেখায়—আত্মশুদ্ধি, সময়ের সঠিক ব্যবহার, কান্নাভেজা দোয়া এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। আজ যখন রমজান অনেক সময় বাহ্যিক আয়োজন ও ব্যস্ততায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তাদের জীবন আমাদের সামনে এক বাস্তব ও জীবন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়।