
বিকেলের আলো একটু নরম হতে শুরু করলেই চট্টগ্রাম নগরের পুরোনো অংশে ব্যস্ততার গতি বদলে যায়। বিশেষ করে আন্দরকিল্লা এলাকায় তখন তৈরি হয় এক অন্য রকম আবহ। ইফতারের প্রস্তুতিতে মুখর হয়ে ওঠে আন্দরকিল্লা শাহি জামে মসজিদ প্রাঙ্গণ।
মসজিদের খোলা চত্বরে শামিয়ানা টানিয়ে সারি সারি চাটাই পাতা হয়। তার ওপর একে একে সাজানো হচ্ছে প্লেট। স্বেচ্ছাসেবকেরা দল বেঁধে পেঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা ও মুড়ি ভাগ করে দিচ্ছেন। পাশে বড় ড্রামে রুহ আফজা, লেবু ও চিনি মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে লালচে শরবত। ইফতারের প্রস্তুতির এই দৃশ্য প্রতিদিনই দেখা যায়, কিন্তু তার আবেদন একটুও কমে না।
এই গণইফতারের আয়োজন নতুন কোনো উদ্যোগ নয়। টানা ২৪ বছর ধরে নিয়মিতভাবে চলছে এই কর্মসূচি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু আয়োজনের মূল চেতনা রয়ে গেছে একই—সবাইকে একসঙ্গে বসে ইফতার করানো।
ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলে মসজিদ প্রাঙ্গণে জড়ো হতে থাকেন হাজারো রোজাদার। কেউ আসেন দূরদূরান্ত থেকে, কেউ পথচারী, কেউ শ্রমজীবী মানুষ, দোকানকর্মী কিংবা শিক্ষার্থী। অফিস শেষে অনেকে এখানে এসে ইফতার করেন, আবার কেউ কাজের ফাঁকে সময় বের করে আসেন এই আয়োজনে।
একসারি চাটাইয়ে পাশাপাশি বসে ইফতার করেন সবাই। এখানে নেই ধনী-গরিবের ভেদাভেদ, নেই পরিচয়ের আলাদা কোনো গুরুত্ব। একই জায়গায় বসে, একই খাবার ভাগ করে নিয়ে ইফতার করেন সবাই। এই একসঙ্গে বসে থাকার মধ্যেই যেন রমজানের মূল শিক্ষা ফুটে ওঠে।
ইফতারের মিনিট কুড়ি আগে মসজিদ প্রাঙ্গণে ব্যস্ততা চরমে ওঠে। কোথাও প্লেটের সারি বাড়ানো হচ্ছে, কোথাও শরবতের ড্রাম ভরে তোলা হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবকদের হাঁটাচলা তখন দ্রুত, কিন্তু তাতে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। সবাই যেন জানেন, কখন কোথায় কী করতে হবে।
আজানের ঠিক আগমুহূর্তে পুরো প্রাঙ্গণ নীরব হয়ে আসে। হাজার মানুষের ভিড়েও তখন এক ধরনের শৃঙ্খলা লক্ষ্য করা যায়। সবাই অপেক্ষায় থাকেন মাগরিবের আজানের জন্য। আজান ভেসে উঠতেই একসঙ্গে খেজুর হাতে ওঠে, শরবতের গ্লাস মুখে যায়। মুহূর্তেই শুরু হয় ইফতার।
এই আয়োজন কেবল খাবারের নয়; এটি অপেক্ষার গল্প, প্রস্তুতির গল্প এবং মানবিক বন্ধনের গল্প। প্রতিদিনের ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা কিংবা একাকিত্ব যেন ইফতারের প্রথম চুমুকেই অনেকটাই হালকা হয়ে যায়।
রমজান মাস এলেই আন্দরকিল্লা শাহি জামে মসজিদ প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে এক মিলনমেলা। এখানে ইফতার মানে শুধু রোজা ভাঙা নয়, বরং একে অপরের পাশে বসে সময় ভাগ করে নেওয়া। হাজার মানুষের এই ইফতার আয়োজন তাই চট্টগ্রামের রমজানের এক অনন্য ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে।