
কক্সবাজারের রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের পানেরছড়া এলাকায় গত সপ্তাহে একটি মানবিক ও প্রশাসনিক জটিলতার ঘটনা ঘটেছে। আড়াই মাস ধরে কারাগারে থাকা ফরিদুল আলম (৪৩) ও মোহাম্মদ ইসলাম (৩৮) প্যারোলে মুক্তি পেয়ে তাদের মা ও বাবার জানাজায় অংশ নেন, কিন্তু হাতকড়া পরা অবস্থায়।
গত ২১ ফেব্রুয়ারি তাদের মা মোস্তফা বেগম (৮০) বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান। এরপর দুই ভাইকে পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় যাতে তারা মা-বাবার জানাজায় অংশ নিতে পারে। মায়ের জানাজা দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়। পুলিশ নিশ্চিত করেছিল যে, কারাবন্দি দুই ভাইকে হাতে হাতকড়া পরিয়ে রাখার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে।
মায়ের জানাজার ছবিগুলি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়ভাবে সমালোচনা শুরু হয়। এমন পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ স্থানীয় গ্রামবাসীর সহযোগিতা নিয়ে বাবার জানাজার সময় একই ধরনের সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি বাবার নুর আহমদের জানাজায় দুই ভাই অংশ নিলে এবার চারপাশে গ্রামবাসীর কড়া নজরদারি ও পাহারা থাকতেও দেখা যায়।
পুলিশের লক্ষ্য ছিল, কারাবন্দি অবস্থায় হাতকড়া পরা দুই ভাইয়ের ছবি গণমাধ্যমে যেন প্রকাশ না পায়। তবে সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্বে থাকা কারণে ছবি তোলার চেষ্টা করেন। এই দ্বন্দ্বে পুলিশ ও সাংবাদিক উভয়ই সংকটের মধ্যে পড়েন। গ্রামবাসী সাংবাদিকদের সরাতে তৎপর থাকেন, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। চারপাশে গ্রামবাসীর নজরদারিতে বাবার জানাজা সম্পন্ন হয়।
রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, “মায়ের জানাজায় হাতকড়া পরা দুই ভাইয়ের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় সমালোচনা হয়েছিল। বাবার জানাজায় একই ঘটনা এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পেশাগত কারণে সাংবাদিকদের ছবি প্রয়োজন, কিন্তু পুলিশও অযাচিত ছবির প্রচার রোধে তৎপর ছিল।”
স্থানীয় সূত্র জানায়, দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে রামু থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এদের অভিযোগ করা হয় আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে। প্রায় আড়াই মাস ধরে তারা কারাগারে ছিলেন। প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার পরও তাদের উপর আইনগত ও নিরাপত্তার দিক থেকে কড়া নজরদারি রাখা হয়েছিল।
এই ঘটনার ফলে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ, অন্যদিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দুই ভাইকে পরিবারের শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে সাংবাদিক ও পুলিশের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং গণমাধ্যম স্বাধীনতার প্রশ্নও উঠেছে।
জানাজার সময় ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পুলিশ, গ্রামবাসী এবং সাংবাদিকদের মধ্যে জটিল সমন্বয় তৈরি হয়। মানুষের মানবিক দৃষ্টিকোণ, কারাবন্দি অবস্থায় ব্যক্তির মর্যাদা এবং তথ্য পরিবেশনের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা এই ঘটনাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে।
সংক্ষেপে, কারাগারে থাকা দুই ভাইয়ের প্যারোলে মুক্তি, হাতকড়া পরা অবস্থায় জানাজায় অংশগ্রহণ এবং সেই সঙ্গে পুলিশ ও সাংবাদিকদের মধ্যে সৃষ্ট উভয় সংকট কক্সবাজারে এক অনন্য পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এটি মানবিক, আইনগত এবং সাংবাদিকিক দায়িত্বের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করার একটি উদাহরণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।