
রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বেওয়ারিশ কুকুর শিকার করে সেগুলো ভারতের মিজোরাম রাজ্যে পাচার করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, আকারভেদে প্রতিটি কুকুর ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লংগদু উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে বিশেষভাবে তৈরি বাঁশের ফাঁদ ব্যবহার করে কুকুর ধরা হচ্ছে। পরে সেগুলো নৌকাযোগে কাপ্তাই হ্রদ পার হয়ে বরকল উপজেলায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে সীমান্তবর্তী এলাকা ব্যবহার করে কুকুরগুলো ভারতের মিজোরামে পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মিজোরামের জনপ্রিয় বসন্ত উৎসব ‘চাপচার কুট’ সাধারণত মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত হয়। কৃষিভিত্তিক এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মিজোরামের কিছু এলাকায় কুকুরের মাংসের চাহিদা বাড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, আসন্ন উৎসবকে সামনে রেখে সম্প্রতি কুকুর শিকার ও পাচারের তৎপরতা বেড়েছে।
বাংলাদেশে এ ধরনের কর্মকাণ্ড আইনত অপরাধ। ২০১৯ সালের প্রাণী কল্যাণ আইন অনুযায়ী মালিকবিহীন কুকুর বা অন্য কোনো প্রাণী হত্যা কিংবা অপসারণ দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য। একইভাবে ভারতে, বিশেষ করে মিজোরাম রাজ্যে কুকুর জবাই ও বিক্রি নিষিদ্ধ। ২০২০ সালের মার্চে মিজোরাম বিধানসভায় ‘মিজোরাম অ্যানিম্যাল স্লটার (সংশোধন) বিল, ২০২০’ পাস হয়, যার মাধ্যমে কুকুরকে ভোজ্য প্রাণীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিকারি দাবি করেছেন, তারা বরকল উপজেলা থেকে এসেছেন এবং মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্যেই কুকুর ধরেছেন। পাচারের অভিযোগ তারা অস্বীকার করলেও স্থানীয়রা বলছেন, সংগঠিতভাবেই এই কাজ চলছে।
রাঙ্গামাটি জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. দেবরাজ চাকমা বলেন, বসন্ত উৎসবকে কেন্দ্র করে মিজোরামের কিছু এলাকায় কুকুরের মাংস খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। সেই কারণেই উৎসব সামনে রেখে কুকুর শিকার বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করছেন।
রাঙ্গামাটি জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৯-এর ৭ ধারা অনুযায়ী মালিকবিহীন কুকুর হত্যা বা অপসারণ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তিনি জানান, কুকুর জলাতঙ্কসহ বিভিন্ন রোগ বহন করতে পারে এবং বেওয়ারিশ কুকুরের মাংস খাওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, কোনো এলাকায় কুকুরকে নিয়মিত ভ্যাকসিন দেওয়া হলে সেখান থেকে হঠাৎ কুকুর সরিয়ে নেওয়ার ফলে একটি শূন্যতা তৈরি হয়। এতে অন্য এলাকা থেকে টিকাবিহীন কুকুর এসে ওই জায়গা দখল করে নেয়, যা রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ায়। এ কারণেই নির্বিচারে কুকুর অপসারণে আইনগত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, কুকুর শিকার ও পাচারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তারা ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং প্রাণীকল্যাণ বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।